টিউলিপের প্রভাবে পূর্বাচলে প্লট পান শেখ রেহানা
শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা সিদ্দিককে পূর্বাচলে ১০ কাঠার প্লট পাইয়ে দিতে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করেন ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। চলতি বছরের ১০ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আদালতে দাখিল করা প্লট দুর্নীতি মামলার অভিযোগপত্রে এ তথ্য উঠে আসে।
গত ২৭ নভেম্বর আলোচিত প্লট দুর্নীতির ছয়টি মামলার মধ্যে শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে তিনটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। ওইসব মামলায় শেখ হাসিনাকে তিন মামলায় ২১ বছরের কারাদণ্ড ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ৬ মাস করে মোট ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদকে পৃথক ৫ বছর করে কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন এ রায় ঘোষণা করেন।
অপর তিনটি মামলার মধ্যে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে জালিয়াতির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, রেহানার মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলার রায় জানা যাবে আগামীকাল সোমবার (১ ডিসেম্বর)। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক রবিউল আলম এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন।
এছাড়া শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা শুনানির শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
গত ১৩ জানুয়ারি রাজধানীর পূর্বাচলে ১০ কাঠার প্লট জালিয়াতির ঘটনায় দুদকের উপ-পরিচালক সালাউদ্দিন বাদী হয়ে রেহানা সিদ্দিক, টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত ২৪ মার্চ রেহানা সিদ্দিক, টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, শেখ হাসিনা ১৭ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারি পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, শেখ রেহানার রাজউকের এখতিয়ারাধীন এলাকায় ফ্ল্যাট থাকার পরও হলফনামায় তথ্য গোপন করেছেন। তিনি প্লট আবেদন করার সময় রাজউকের আইন অনুসরণ করেননি। তার মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক বিশেষ ক্ষমতায় এবং খালা শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করে মা, ভাই ও বোনকে প্লট পাইয়ে দেওয়ার দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, শেখ রেহানা সিদ্দিক প্লট পাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও মেয়ে টিউপিল সিদ্দিকের মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ নেন। হলফনামায় শেখ রেহানা ঢাকার সেগুনবাগিচায় ফ্ল্যাট ও কোনাবাড়িতে ১৬০ শতাংশ জমি থাকার কথা না বললেও আয়কর রিটার্নে বলেছেন। এছাড়া শেখ রেহানা রাজউকে কোনো ধরনের আবেদন না করে বোন শেখ হাসিনার কাছে আবদার করেই রাজউকের ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেন।
দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা তার ক্ষমতাবলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্য কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে শেখ রেহানার নামে প্লট বরাদ্দ দেন। শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি আয়কর রিটার্নে সম্পত্তির তথ্য দিলেও হলফনামায় গোপন করেছেন। অপরদিকে শেখ রেহানা সিদ্দিকের বড় মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকও আয়কর রিটার্নে গুলশানে ফ্ল্যাট রয়েছে বললেও হলফনামায় গোপন করেছেন।
এতে আরও বলা হয়েছে, টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক বর্তমানে যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পস্টেড এবং হাইগেট অঞ্চলের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। টিউলিপ ব্রিটেনে বসে জানতে পারেন, তার খালা শেখ হাসিনা, ছেলে সজীব আহমেদ ওয়াজেদ (জয়) ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ নিচ্ছেন। সে সময় তিনি ব্রিটিশ এমপি হিসেবে প্রভাব খাঁটিয়ে মা রেহানা সিদ্দিক, বোন আজমিনা সিদ্দিক ও ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দের জন্য ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।
অভিযোগপত্রে দুদক উল্লেখ করে, দ্য ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (অ্যালটমেন্ট অব ল্যান্ডস) রুলস ১৯৬৯-এর ৯ বিধি সাপেক্ষে, ট্রাস্ট এমন ব্যক্তিকে প্লট বরাদ্দ করতে পারে, যারা সরকারি চাকরি, জনসেবা কিংবা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তবে এই বিধি অনুযায়ী কেউ নির্ধারিত ফরমে আবেদন না করলে এবং সরকার সুপারিশ না করলে তিনি বা তারা প্লট বরাদ্দ পাবেন না।
দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রেহানা সিদ্দিক অসৎ উদ্দেশ্যে আপন বোন শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করে রাজউকে কোনো আবেদন না করেই সরকারি জমি আত্মসাৎ করে ভোগদখল রেখেছেন। যা দণ্ডবিধির ১৬১, ১৬৩, ১৬৪, ১৬৫(ক), ৪০৯, ৪২০, ১০৯ এবং দুদক আইনের ৫ (২) ধারায় অপরাধ করেছেন।
এ মামলায় শেখ রেহানা ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন– টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, শেখ হাসিনা, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার, সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. অলিউল্লাহ, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা, রাউজকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) খুরশীদ আলম, রাউজকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রন) তন্ময় দাস, রাউজকের সাবেক সদস্য পরিকল্পনা নাসির উদ্দিন, রাজউকের সাবেক সদস্য সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী, সহকারী পরিচালক এস্টেড ও ভূমি মাজহারুল ইসলাম, রাজউকের উপপরিচলক নায়েব আলী শরীফ, রাজউকের সাবেক পরিচালক নুরুল ইসলাম, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহম্মেদ। রাজউকের কর্মকর্তা খুরশীদ আলম ছাড়া বাকি সব আসামি বর্তমানে পলাতক আছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক