বিজয় উদযাপনে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল
লাখো মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পালিত হলো মহান বিজয় দিবস। বাঙালির শৌর্যবীর্য ও বীরত্বের এই অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিনের সাক্ষী হতে পৌষের প্রথম দিনের ভোরটা ছিল অন্যরকম। আগের দিনের সন্ধ্যা থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঘিরে ফেলা হয় স্মৃতিসৌধে ও আশপাশের এলাকা।
বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠা হাজারো জনতা কুয়াশা ভেদ করে ভোর থেকেই জড়ো হতে থাকেন স্মৃতিসৌধের আশপাশে। বিজয়ের ৫৫ বছর উদযাপনকে ঘিরে বর্ণিল আলোয় সাজানো হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ। কুয়াশা ঢাকা ভোরের স্নিগ্ধতায় লাল-সবুজের আলোকচ্ছটায় ঝলমলে পরিবেশ মুগ্ধতা ছড়ায় দর্শনার্থীদের।
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধের আনুষ্ঠানিকতা।
মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি প্রথমে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রবেশ করে মূল বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর পুষ্পস্তবক অর্পণের পর রাষ্ট্রপতি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
এরপর সকাল ৬টা ৫৬ মিনিটে জাতীয় স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
পুষ্পস্তবক অর্পণের পর শহীদদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত চৌকস দল রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানায়, বিউগলে বাজে করুণ সুর।
শ্রদ্ধা জানানোর পর ড. ইউনূস উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সেনা কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন।
সকাল ৭টা ৫ মিনিটে ফুল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের (আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ) বিচারপতি তার সঙ্গে ছিলেন।
স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানো শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
আসিফ নজরুল বলেন, ১৬ ডিসেম্বরের যে প্রত্যয় ছিল, তা দেখেই আমরা ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পুনর্নির্মাণের একটা সুযোগ করে দিতে পেরেছি। ১৬ ডিসেম্বর দেশের মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠতম একটা দিন। এই দিনে আমরা যখন জাতীয় স্মৃতিসৌধে আসি, আমাদের যে মুক্তিযুদ্ধকালীন গৌরবগাঁথা, আমাদের সেই অসামান্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান, আমাদের দেশ গড়ার যে প্রত্যয় সেগুলো সব মনে পড়ে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল একটা গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার, বৈষম্যহীন সমাজ। আমরা তা অর্জন করতে পারিনি, পারিনি বলেই তো গণঅভ্যুত্থান-বিপ্লব হলো। আমরা আজকে এমন একটা সন্ধিক্ষণে আছি, যেখানে আমরা একটা শাসন ব্যবস্থাকে পেছনে ফেলে নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করব।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের নির্বাচন। আশা করছি, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করব। এজন্য যেখানে কেবল একটা নির্বাচনই হচ্ছে না একটা গণভোটও হচ্ছে। যেখানে সংস্কার প্রশ্নে বড় কতগুলো বিষয়ে জনগণ তাদের মতামত জানাতে পারবে। এখন তার ওপর নির্ভর করে গণতন্ত্রের যাত্রাটা এবার পরিবর্তিত আকারে শুরু হতেই পারে।
প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টাদের প্রস্থানের পর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খুলে দেওয়া হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ।
হাতে লাল সবুজের পতাকা,গালে আঁকা বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ঢল নামে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। তাদের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি।
ফুল, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠন ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্যরা স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে ভিড় করে।
জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গোলাম আজম জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হলে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানটা কোথায়?
জামায়াত নেতা গোলাম আযম ও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ‘জাতির সূর্যসন্তান’ আখ্যায়িত করে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হচ্ছে অভিযোগ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস আরও বলেন, ‘গোলাম আযমসহ ওর সাঙ্গপাঙ্গরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান–এসব বলে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানিত করা হচ্ছে। এই দলটি কখনোই দেশের শান্তি কখনো কামনা করেনি। তারা দেশের স্বাধীনতা চায়নি। এখনও তারা দেশের স্বাধীনতা চায় না। তারা চায়, দেশটা একটা বিপাকে পড়ুক, একটা খারাপ অবস্থায় চলে যাক, অশান্তির বাংলাদেশ থাকুক।’
একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি করা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এই বিএনপিনেতা বলেন, ‘একাত্তর এবং চব্বিশ যার যার অবস্থানে স্বমহিমায় বিরাজিত। একাত্তরের সঙ্গে চব্বিশের কোনো তুলনা হয় না এবং হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই।’
ডাকসুর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানোর শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ।
সাদিক কায়েম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল গত ৫৪ বছরে তা আমরা পাইনি।
জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, বিজয়ের ৫৪ বছরেও দেশে ইনসাফ কায়েম হয়নি, যা মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল।আগামীর বাংলাদেশে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন তিনি।
এদিকে সকাল থেকেই জাতীয় স্মৃতিসৌধে লক্ষ্য করা গেছে নির্বাচনি আমেজ। বিশেষ করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকরা দলীয় স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন স্মৃতিসৌধ।
মনোনয়নব ঞ্চিতরাও কম যাননি। কর্মী-সমর্থকদের বিশাল বহর নিয়ে তারাও রীতিমতো শোডাউন করে যান স্মৃতিসৌধে। মুহুর্মুহু স্লোগানের মাধ্যমে প্রদর্শন করেন নিজেদের শক্তি আর সামর্থ্য।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে পরিবারের সঙ্গে জাতীয় স্মৃতিসৌধে এসেছেন কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী শর্মি সুলতানা আঁখি। তিনি বলেন, আমার বাবার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের পরে। দাদা বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এখন বেঁচে নেই। মুক্তিযোদ্ধারা যে লক্ষ্য পূরণে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন আজও কেন তা পূরণ হলো না। তাহলে কি তাদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যাবে!
আঁখির বাবা বেলায়েত হোসেন সরকারের কণ্ঠেও একই আক্ষেপ, বিজয়ের সাড়ে পাঁচ দশক পরেও মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কেন বিতর্ক থাকবে? কেন এই জাতির মধ্যে এত বিভাজন!
গাজীপুর থেকে এসেছিলেন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ। ক্ষুব্ধ ভঙ্গিমায় জনপ্রিয় একটি গান উদ্ধৃত করে বলেন, ‘কী দেখার কথা কী দেখছি? কী শোনার কথা কী শুনছি? কী ভাবার কথা কী ভাবছি? কী বলার কথা কী বলছি? তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাকে খুঁজছি।’

জাহিদুর রহমান