‘পাবনা-১ ও ২ নির্বাচন স্থগিত করে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে ইসি’
সীমানা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতার কারণে পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়ার আংশিক) ও পাবনা-২ (সুজানগর-বেড়ার আংশিক) আসনের নির্বাচন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এই এলাকার মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে। ইসি আদালতের আদেশের সঠিক প্রয়োগ করেনি। এই দুটি আসনের সব বৈধ প্রার্থী তাদের নিজ নিজ ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে এই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
এদিকে নির্বাচন স্থগিতের পর এই আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী ব্যারিস্টার নজিবুর রহমান মোমেন নির্বাচন ইসির সচিব ও উপসচিবের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন। তার পক্ষে তার আইনজীবী কাজী মোহাম্মদ ইলিয়াস আজ রোববার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে ইসিতে এই নোটিশ পাঠান।
নির্বাচন স্থগিতের পর জামায়াতের প্রার্থী ব্যারিস্টার নজিবুর রহমান মোমেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘বাতাসে ষড়যন্ত্রের গন্ধ। আদালত নির্বাচন বন্ধ করার কোনো আদেশ দেননি। সাঁথিয়া, বেড়া, সুজানগরবাসীর ভোটাধিকার নিয়ে ইসিকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে আইনি লড়াইসহ সবাইকে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক তথ্যপ্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ লেখেন, ‘পাবনা-১, সাথিয়া-বেড়া (আংশিক) নির্বাচনি এলাকায় একটি অশুভ কালো ছায়া ভর করেছে। যা বিগত ৫৪ বছরেও হয়নি। এলাকাবাসীর প্রতি আমার আহ্বান, এই বিভাজনের রাজনীতি যিনি বা যারা করেছেন তাদের প্রত্যাখ্যান করা। ইনশাআল্লাহ আমাদের প্রচেষ্টা হবে, আগের মতো পাবনা-১ আসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।’
পাবনা-১ আসনের বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ভিপি শামসুর রহমান ভিপি শামসু ‘প্রিয়, পাবনা-১ আসনবাসী, আসসালামু আলাইকুম। আপনারা সবাই জানেন আপনাদের আসন নিয়ে একটি মহল বরাবরই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, এই আসন ভাগাভাগি বা একসঙ্গে থাকা নিয়ে কখনোই কিছু আমার মাথায় আসেনি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মধ্যে কোনো ধরনের ক্রিমিনাল চিন্তা নেই। এই আসন নিয়ে শুধু নির্বাচন কমিশন ছিনিমিনি খেলেছে এমন নয়, পতিত, পরাজিত শক্তিও এর সঙ্গে জড়িত। সময়ের সবচেয়ে বড় মুনাফেকি চরিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি বারবার, তাদের মধ্যে। নির্বাচন কমিশন আমাদের সঙ্গে যে শাপ-লুডু খেলছে, সেই অন্যায় আচরণ, প্রহসনমূলক সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে না।’
প্রিয় এলাকাবাসী, আমি আবারও ডাক দিচ্ছি, আবারও আহ্বান করছি, আবারও অনুরোধ করছি, আপনারা গর্জে উঠুন। আমরা লড়াই-সংগ্রাম করে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এসেছি, আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কারও ছিনিমিনি খেলার জন্য নয়।
আমরা আইনের প্রতি সদাসর্বদা শ্রদ্ধাশীল আছি, থাকব, কিন্তু যদি এহেন অবিচার, বারংবার করা হয়, অন্যায় সিদ্ধান্ত দীর্ঘায়িত করে, আমাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়, তাহলে আমরা রাজপথে নেমে, সেই অধিকার আদায় করে নিব ইনশা আল্লাহ।
পাবনা-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যডভোকেট এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব বলেন, নির্বাচর স্থগিতের খবর শুনে এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এটা অগ্রহণযোগ্য ও অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত।
একই আসনের জামায়াতের প্রার্থী কে এম হেসাবউদ্দিন বলেন, নির্বাচন স্থগিত কোনো ষড়যন্ত্র কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। নির্বাচন স্থগিত করার খবরে প্রার্থী সমর্থক ও ভোটারদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে। একেক সময় একেক ধরনের খবরে মানুষ চরম বিরক্ত। নির্বাচনের মধ্যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কোনো মতেই ঠিক হয়নি বলে জানিয়েছেন অনেক প্রার্থী। নির্বাচন স্থগিতের খবরে পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার প্রায় ৯ লাখ ভোটার ও ১১ প্রার্থী ও সমর্থকরা সবাই অস্বস্তিতে পড়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করে। তাতে সাঁথিয়া উপজেলার পুরোটা নিয়ে পাবনা-১ আসন এবং সুজানগর ও বেড়া উপজেলাকে মিলিয়ে পাবনা-২ আসন চূড়ান্ত করা হয়।
ইসির ওই গেজেটের এই দুটি আসন সংক্রান্ত অংশটুকুর বৈধতা নিয়ে বেড়া উপজেলার বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম এবং সাঁথিয়া উপজেলার বাসিন্দা আবু সাঈদ হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল দেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল যথাযথ (অ্যাবসলিউট) ঘোষণা করে গত ১৮ ডিসেম্বর রায় ঘোষণা করেন।
তবে পাবনা-১ ও ২ আসনে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন আপিল আবেদন করলেও হঠাৎ তা প্রত্যাহার করে নেয়। পরে হাইকোর্টের রায়ের আলোকে ২৪ ডিসেম্বর পাবনা-১ ও ২ এবং ফরিদপুর-২ আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনে গেজেট প্রকাশ করে। এতে সাথিয়া উপজেলার পাশাপাশি বেড়া উপজেলার একটি পৌরসভা ও চারটি ইউনিয়ন নিয়ে পাবনা-১ আসন গঠন করা হয়। একইভাবে পাবনা-২ আসনে সুজানগর উপজেলা ও বেড়া উপজেলার ওই পৌরসভা ও চারটি ইউনিয়ন বাদ দেওয়া হয়।
এরপর গত ৫ জানুয়ারি আপিল বিভাগের রায়ে ইসির ২৪ ডিসেম্বরের সংশোধিত বিজ্ঞপ্তির অংশটুকু স্থগিত করা হয়। এই স্থগিতাদেশ থাকবে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করা পর্যন্ত বলে রায় দেন আপিল বিভাগ। এর ফলে নির্বাচন কমিশন ওই দুটি আসনের সীমানায় যে পরিবর্তন এনেছিল, তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় বা বহাল হয়।

এ বি এম ফজলুর রহমান, পাবনা