সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুরসহ আটজনের ভাগ্য নির্ধারণ আজ
২০২৪ সালে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দিন রাজধানীর চানখারপুলে শহীদ আনাস, ইয়াকুবসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীসহ আটজনের বিরুদ্ধে আজ সোমবার (২৬ জানুয়ারি) রায় ঘোষণা করা হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করবেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। মামলাটির রায় ঘোষণা বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
এ মামলায় চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, মীজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম, ফারুক আহম্মেদ, তারেক আব্দুল্লাহ। অপরদিকে, আসামিপক্ষে ছিলেন সাদ্দাম হোসেন অভি, সিফাত মাহমুদ শুভ ও আবুল হাসান। পলাতক চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী কুতুবউদ্দিন আহমেদ।
এ বিষয়ে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা চায়নিজ রাইফেল ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়। যারা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের গালাগাল করা হয়, হুমকি দেওয়া হয়। ছয়জনকে হত্যার পাশাপাশি অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে গুলি করে আহত করা হয়। প্রসিকিউশন মামলা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রত্যেকেরই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে।
এ মামলায় আটজন আসামি রয়েছেন। এরমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া চার আসামি হলেন—শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল সুজন মিয়া, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলাম। পলাতক আসামিরা হলেন—সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম ও রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল।
আসামিদের আইনজীবীরা বলেন, পদ অনুযায়ী কমান্ডিং অফিসার হতে পারেন না আসামিরা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই জুলাই আন্দোলনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তারা। রায়ে আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন।
মামলাটিতে মোট ২৩ কার্যদিবসে ২৬ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে শহীদদের পরিবারের সদস্য, প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ কর্মকর্তারা রয়েছেন। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদও আদালতে সাক্ষ্য দেন।
গত ১৪ জুলাই চানখারপুলে মামলাটির পলাতক চার আসামিসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখারপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালায় পুলিশ। এতে বহু হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি শাহরিয়ার খান আনাসসহ ছয়জন নিহত হয়। অপর নিহতরা হলেন—শেখ জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেওয়া হয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ২৫ মে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে তা দাখিল করেন। অভিযোগ আমলে নিয়ে সেদিন ট্রাইব্যুনাল হাবিবুর রহমানসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চানখারপুল এলাকায় আসামিরা নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করে। তদন্ত প্রতিবেদনটি ৯০ পৃষ্ঠার। প্রতিবেদনে ৭৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। তবে ট্রাইব্যুনালে ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া ১৯টি ভিডিও, পত্রিকার ১১টি রিপোর্ট, দুটি অডিও, বই ও রিপোর্ট ১১টি এবং ছয়টি ডেথ সার্টিফিকেট সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি অডিও কল রয়েছে হাবিবুর রহমানের, যিনি পুলিশ কমান্ড সেন্টার থেকে ওয়ারল্যাসের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন পুলিশ সদস্যদের। তার এই নির্দেশের পরই প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন পুলিশ সদস্যরা।
২০২৫ সালের ১৪ জুলাই আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ মোট ২৬ জন এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।
সর্বোচ্চ শাস্তি চান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া
সাক্ষীর জবানবন্দিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, আমি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সমন্বয়ক ছিলাম। আন্দোলনের একপর্যায়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন আমাদের আন্দোলন প্রত্যাহার করতে যোগাযোগ শুরু করেন। ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখার সময় আমাদের বারবার বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে আমাদেরকে ডিবি কার্যালয় তুলে আনা হয়েছে। আন্দোলন প্রত্যাহারে রাজি না হলে আমাদের হত্যা করা হবে মর্মে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ রয়েছে। তবে তারা (ডিবি) দয়া করে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখারপুলে হতাহতের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে বলেন, ওইদিন আমার সামনেই পুলিশের গুলিতে দুজন নিহত হন। পরবর্তীতে জানতে পারি, সেখানে ওইদিন ছয়জন আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সেদিন ওখানে পুলিশ চাইনিজ রাইফেল ও শর্ট গান দিয়ে গুলি করে। সেদিন বেলা দেড়টার দিকে আমরা জানতে পারি, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
চানখারপুলে হত্যাকাণ্ডের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, গুলি চালানো পুলিশ ও কমান্ড কর্তৃপক্ষ দায়ী বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
‘যদি না ফিরি, তাহলে গর্বিত হইয়ো’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর চানখারপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা মামলায় ট্রাইব্যুনালে প্রথম সাক্ষ্য দেন শহীদ আনাসের বাবা শাহরিয়ার খান পলাশ। সাক্ষ্য দেওয়ার শুরুতে তিনি আদালতের উদ্দেশে বলেন, ঘাতকদের বসানো হয়েছে কেন? এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, এটা কোর্টের সিস্টেম। এটা আন্তর্জাতিক আদালত। কোনো আসামি তথ্যপ্রমাণে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা নির্দোষ হিসাবে ধরে নিই। তাই সে বিষয়ে না বলে আপনি ন্যায়বিচারে সহযোগিতা করেন। যা বলতে এসেছেন, তা বলেন।
পরে শাহরিয়ার খান পলাশ জবানবন্দিতে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমি, আমার স্ত্রী, দুই সন্তান সাফওয়ান (৫) ও সুফিয়ান (২) গেন্ডারিয়ার ভাড়া বাসায় অবস্থান করছিলাম। আমার স্ত্রী আনাসকে ঘরে দেখতে না পেয়ে তার পড়ার টেবিলে যাই এবং সেখানে তার হাতের লেখা একটি চিঠি পায়। চিঠিটা আনাস তার কোচিং ক্লাসের রসায়ন খাতায় রেখে যায়। চিঠিটা একটি ওষুধ কোম্পানির প্যাডে লেখা ছিল। চিঠিটা তার মায়ের উদ্দেশে লিখে যায়। সেখানে লেখা ছিল—‘মা আমি মিছিলে যাচ্ছি। যদি না ফিরি, তাহলে গর্বিত হইয়ো’।
চিঠির কথা উল্লেখ করার পর শাহরিয়ার খান পলাশ বলেন, দুপুরে আনাসের মায়ের মোবাইলে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে এবং জিজ্ঞাসা করা হয়—‘আপনাদের কেউ কি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচিতে গিয়েছে?’ তখন আমার স্ত্রী বলে, ‘আমার ছেলে আনাস গিয়েছে।’ ওই লোকটি তখন আমার স্ত্রীকে দ্রুত মিটফোর্ড হাসপাতালে যেতে বলেন। আমার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আমার মোবাইল নম্বর আপনি কীভাবে পেয়েছেন?’ ফোনে ওই লোকটি বলেন, ‘আপনার ছেলের সঙ্গে থাকা সীমবিহীন মোবাইল থেকে।’ পরে জানতে পারি, ওই লোকটিও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী একজন ছাত্র। তার নাম সৌরভ আহম্মেদ।
শাহরিয়ার খান পলাশ বলেন, সংবাদ শুনে আমি, স্ত্রী ও শ্বশুর মিটফোর্ড হাসপাতালে গিয়ে জরুরি বিভাগের সামনে একটি স্ট্রেচারের ওপর রক্তাক্ত অবস্থায় আমার সন্তানের গুলিবিদ্ধ লাশ দেখতে পাই। সেখানে উপস্থিত আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন ছাত্র-জনতার মাধ্যমে জানতে পারি, চাঁনখারপুল মোড়ে নিমতলী নবাব কাটারা গলিতে আমার ছেলে আনাসকে পুলিশ গুলি করে। তারপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জরুরি বিভাগে ভর্তির টিকিট, আনাসের ব্যবহৃত মোবাইল এবং মৃত্যুসনদ নিয়ে আমরা আনাসকে কোলে করে রিকশায় বাসায় নিয়ে আসি। বাসায় নিয়ে আসার পর আনাসের লাশ নিয়ে এলাকার লোকজন স্বৈরাচার খুনি হাসিনার বিরুদ্ধে মিছিল করে।
আনাসের বাবা বলেন, ওইদিন আসরের নামাজের পর গেন্ডারিয়া ধুপখোলা মাঠে আনাসের জানাজার জন্য নিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, শেখ মেহেদী হাসান জুনায়েদ (১৪ বছর) নামের আরও একজন ছাত্রের লাশ জানাজার জন্য আনা হয়। সে-ও ওইদিনই চানখারপুল এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। দুজনের জানাজা একইসঙ্গে হয়। আমরা আনাসকে গোসল করাইনি। শহীদি মর্যাদায়, অর্থাৎ গোসল না করিয়ে রক্তাক্ত পরিধেয় পোশাকসহ দাফন করি।
শাহরিয়ার খান পলাশ বলেন, চানখারপুলের ওই ঘটনায় আমার ছেলে আনাসসহ ছয়জন নিহত হয়। পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, এডিসি আক্তার, এসি ইমরুল, ওসি (অপারেশনস শাহবাগ) আরশাদের পারস্পরিক নির্দেশে ও নেতৃত্বে কনস্টেবল সুজন, কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন, কনস্টেবল নাসিরুল ইসলামদের গুলিতে ওই ছয়জন শহীদ হয় মর্মে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মাধ্যমে জানতে পারি। আমি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যারা আমার ছেলে আনাসসহ অন্যদের নিহত ও আহত করেছে, তাদের বিচার ও ফাঁসি চাই।
‘আনাসের রক্তে আমাদের তিনজনের শরীর ভেসে গিয়েছিল’
রাজধানীর চানখারপুলে পুলিশের গুলিতে নিহত দশম শ্রেণির ছাত্র শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দিপ্তী ছয়জন হত্যা মামলার সাক্ষী হয়ে আসামিদের ফাঁসি চান। সাক্ষীর জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে জুলাই মাসে আন্দোলনকারী নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছিল। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট সকালবেলা আনাসকে ঘরে না পেয়ে তার রুমে যাই। সেখানে পড়ার টেবিলে একটি চিঠি পাই। চিঠিতে লেখা ছিল সে মিছিলে যাচ্ছে। সে নিজেকে আটকাতে পারেনি। চিঠিতে সে আরও লিখেছে, আমার ভাইয়েরা ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য কাফনের কাপড় মাথায় বেধে রাজপথে সংগ্রাম করে যাচ্ছে, অকাতরে নিজের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে। একদিনতো মরতে হবে। তাই মৃত্যুর ভয়ে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে গুলি খেয়ে মৃত্যু অধিক শ্রেয়। যে অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয় সেই প্রকৃত মানুষ। যদি বেঁচে না ফিরি কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হইয়ো। চিঠিটি আনাস আমার উদ্দেশে লিখেছে (এ পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ আনাসের মা)।
জবানবন্দিতে সানজিদা খান দীপ্তি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে একটি চিঠি লিখে রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়েছিল আনাস। চিঠিতে আনাস লিখেছিল, ‘মা আমি মিছিলে যাচ্ছি। যদি না ফিরি তাহলে গর্বিত হইও।’ ঠিক দুপুরে তার মৃত্যুর খবর পাই আমরা। পরে তার লাশ আনতে মিটফোর্ড হাসপাতালে যাই। সঙ্গে তার বাবা ও নানাও ছিলেন। লাশটি নিয়ে রিকশায় করে বাসার উদ্দেশে রওনা দেই আমরা। ওই সময় আনাসের রক্তে আমাদের তিনজনের শরীর ভেসে গিয়েছিল।
জবানবন্দিতে আনাসের মা বলেন, ঐদিন (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) আন্দোলনকারীদের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ছিল। আমি ও আমার স্বামী আশপাশে আনাসকে খুঁজি কিন্তু পাচ্ছিলাম না। দুপুর ১টা ২০ মিনিটের দিকে অপরিচিত একটি নম্বর থেকে আমার ফোনে কল আসে। সে বলে যে আপনাদের কেউ কি আন্দোলনে গিয়েছে? আমি বলি, আমার ছেলে গিয়েছে। সে আমাকে দ্রুত স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে বলে। সে আরও বলে, আপনার ছেলের ফোনে আপনার নম্বর সেভ করা ছিল। সেখানে গিয়ে দেখি আমার ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় স্ট্রেচারে পড়ে আছে (এ সময় সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন)। আমি আনাসকে জড়িয়ে ধরি। তখন সৌরভ নামের একটি ছেলে যে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল, সে আমাদেরকে জানায়—আন্দোলন চলাকালে চানখারপুলে পুলিশ টার্গেট করে গুলি করেছিল।
আনাসের মা বলেন, সৌরভ আনাসের ব্যবহৃত ফোন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের টিকিট ও মৃত্যুর সনদপত্র আমাকে প্রদান করে। মৃত্যু সনদে আনাসের মৃত্যুর কারণ গানশট ও স্পট ডেড লেখা ছিল। এরপর একটি অটোরিকশায় আনাসেকে কোলে নিয়ে আমরা বাসায় আসি। আনাসের রক্তে আমাদের কাপড় ভিজে যায়। বাসায় আসার পর এলাকাবাসী আনাসের লাশ নিয়ে মিছিল করে। মিছিলে তারা বলে, ‘আমার ভাই মরল কেন, খুনি হাসিনা জবাব দে।’ একপর্যায়ে আসরের নামাজের পর গেন্ডারিয়া ধুপখলা মাঠে আনাসের নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আনাসের বাবার কাছ থেকে জানাতে পারি আন্দোলন চলাকালে চানখারপুলে পুলিশের গুলিতে নিহত মেহেদী হাসান জুনায়েদকেও সেখানে জানাজার জন্য আনা হয়। দুজনের নামাজের জানাজা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। আনাসকে গোসল দেওয়া হয়নি। স্থানীয় একজন মাওলানার পরামর্শে আনাসকে রক্তাক্ত কাপড়ে শহীদী মর্যাদায় দাফন করা হয়।
আনাসের মা জবানবন্দিতে আরও বলেন, আন্দোলনে আনাসের সঙ্গে থাকা সৌরভ ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানতে পারি, (২০২৪ সালের) ৫ আগস্ট আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে হাজার হাজার আন্দোলনকারী শহীদ মিনারে যাওয়ার পথে চানখারপুল এলাকায় পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। পুলিশ তখন সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও গুলি ছুড়তে থাকে। তারা তখন জীবন বাঁচাতে নবাব কাটারা গলিসহ বিভিন্ন গলির মুখে আশ্রয় নেয়। আনাস নবাবকাটারা গলিতে আশ্রয় নিলে সেখানে একজন পুলিশ আনাসকে লক্ষ্য করে গুলি করে। একটি গুলি আনাসের বুকের বাঁ পাশে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে আনাস মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। গুলিবিদ্ধ আনাসকে তার সঙ্গের আন্দোলনকারীরা রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তখন রাব্বীসহ আরও অনেকে এই হত্যার দৃশ্যের ভিডিও মোবাইলে ধারণ করে। সে ভিডিও সংবলিত পেনড্রাইভ, আনাসের চিঠি, রক্তাক্ত জামা-কাপড়, মৃত্যুর সনদ ও জরুরি বিভাগের টিকিট ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে।
জবানবন্দিতে আনাসের মা বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি, আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ডিএমপির কমিশনার হাবিবুর রহমান ও সুদীপ কুমার চক্রবর্তীর নির্দেশে এবং আক্তারুল ইসলামের নেতৃত্বে এসি ইমরুল, ওসি আরশাদের উপস্থিতিতে কনস্টেবল সুজন, ইমাজ ও নাসিবুল নির্বিচারে ছাত্রজনতার ওপর গুলি চালায়। তাদের গুলিতে আনাস, জুনায়েদ, রাকিব, ইয়াকুব, মামুন ও মানিক শহীদ হয়।
আনাসের মা বলেন, শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের ও আব্দুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশে উপরোক্ত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। আমি হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।
ডায়াসে কাঁদলেন আনাসের নানা সাঈদুর রহমান
ট্রাইব্যুনালের সাক্ষী দিতে এসে জবানবন্দের সময় ডায়াসে দাঁড়িয়ে নাতির লেখা শেষ চিঠি নিয়ে কাঁদেন আনাসের নানা মো. সাঈদুর রহমান। চান হত্যাকারীদের বিচার। সাঈদুর রহমান বলেন, আমি পেশায় ব্যবসায়ী। তবে এখন সবচেয়ে বড় পরিচয় আমি শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসের নানা। (২০২৪ সালের) ৫ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে ঘুম থেকে উঠে আনাসকে বাসায় পাননি জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা তাকে খোঁজাখুঁজি করি। একপর্যায়ে পড়ার টেবিলে একটি চিঠি পায় তার মা। মা-বাবার কাছেই চিঠিটি লিখেছে আনাস।
৬৩ বছর বয়সী এই সাক্ষী বলেন, আনাসের সঙ্গে একটি সিমবিহীন বাটন মোবাইল ফোন ছিল। ওই মোবাইল ফোনে আমাদের পরিবারের চার-পাঁচটি নম্বর সেভ করা ছিল। দুপুর দেড়টার দিকে অপরিচিত নম্বর থেকে একটি কল আসে আনাসের মায়ের মোবাইলে। জানতে চাওয়া হয় আমাদের পরিবার থেকে কেউ আন্দোলনে গিয়েছে কি না। তখন আনাসের মা বলে, ‘আমার ছেলে আনাস আন্দোলনে গিয়েছে।’ তখন অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘আপনারা স্যার সলিমুল্লাহ মিডফোর্ড মেডিকেল হাসপাতালে আসেন। পরে আনাসের মা-বাবাসহ আমরা তিনজন মিডফোর্ড হাসপাতালে যান। সেখানে গিয়ে স্ট্রেচারের ওপর আনাসকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে দ্রুত লাশ নিয়ে যেতে আমাদের বাধ্য করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এরপর আমরা রিকশায় করে আনাসের লাশ বাসায় নিয়ে যান। জানাজা শেষে ওই দিনই জুরাইন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
সাইদুর রহমান বলেন, আমি পরবর্তীতে জানতে পারি চানখারপুলের কাছে নবাব কাটারা এলাকায় আনাস গুলিবিদ্ধ হয়। ওইদিন একই এলাকায় আমার নাতিসহ ছয়জন গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়। তৎকালীন সরকারের পুলিশ বাহিনী তাদের গুলি করে। আর এসব ঘটনার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ যারা গুলি করেছে তাদের দায়ী করছি। একইসঙ্গে তাদের ফাঁসি চাই।
‘জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে আছি’
এ মামলার অপর সাক্ষী শহীদ মো. ইয়াকুবের মা রহিমা আক্তার ছেলের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইয়াকুব হত্যার জন্য দায়ী করেন শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন সরকারের উচ্চপদস্থদের। রহিমা আক্তার বলেন,‘জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে আছি, ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
সাক্ষী রহিমা আক্তার বলেন, ৩৫ বছরের ছেলে ইয়াকুব নিউমার্কেটে ডেলিভারিম্যানের কাজ করত। জুলাই আন্দোলন শুরু হলে প্রায়ই ছাত্রদের সঙ্গে যেত। গত বছরের ৫ আগস্ট চানখারপুল এলাকার আন্দোলনে গিয়েছিল। ওই দিনই সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়। পেটের এক পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অপর পাশ দিয়ে ভুঁড়ি বের হয়ে যায়। প্রথমে আমাকে বলছিল না। সবাই সান্ত্বনা দিচ্ছিল। আমি জানতে চাইলাম, তোমরা কাঁদতেছ কেন? আমারে কাঁদতে দাও না কেন? আমার ছেলের লাশ যখন খাটিয়ায় করে আনা হয়, তখন খাটিয়া বেয়ে অনেক রক্ত পড়ছিল।
একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের টিভি মনিটরে ইয়াকুবের রক্তাক্ত অবস্থার ভিডিও দেখানো হলে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন রহিমা আক্তার। তিনি বলতে থাকেন, ‘আমি একটা মা, জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে আছি। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। হাসিনা, কাদেরসহ যারা গুলির অর্ডার দিয়েছে, আমি তাদের বিচার চাই।’
‘হিন্দিতে কথা বলতে শুনেছি’
পঞ্চম সাক্ষীতে শহীদ ইয়াকুবের চাচা শহিদ আহমেদ জবানবন্দিতে বলেন, (২০২৪ সালের) ৫ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টায় চানখারপুল এলাকা থেকে ভাতিজা ইয়াকুব, আমার ছেলে সালমান, এলাকার রাসেল, সুমন, সোহেলসহ আরও অনেকে গণভবনের উদ্দেশে রওনা দেয়। তখন চানখারপুল এলাকায় হাজার হাজার লোক চারদিক থেকে জড়ো হচ্ছিলেন। দেখলাম চানখারপুল মোড়ের উল্টা পাশে অনেক পুলিশ; ছাপা পোশাকধারী লোকদের হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শুনি। তখন একজন পুলিশ বলছিল, ‘ইধার আও’। তারা আমাদের বাধা দেন। আমাদের লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি করেন। আমরা যে যার মতো ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই।
সাক্ষী শহিদ আহমেদ বলেন, আবার সামনে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি করে। তখন আমাকে একজন বলে–আপনার ভাতিজা ইয়াকুবের গায়ে গুলি লেগেছে। আরও দুজনসহ ভাতিজাকে অটোরিকশায় করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেন, ইয়াকুব মারা গেছে।
সাক্ষী শহিদ বলেন, কারা গুলি করেছে–পরে আমি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুনেছি। শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ছাত্রদের ওপর গুলির নির্দেশ দিয়েছেন। ডিএমপির ইমরুল, ইন্সপেক্টর আরশাদের উপস্থিতিতে কনস্টেবল সুজন, নাসিরুল, ইমাজ গুলি করেন। আরও অনেকেই ছিলেন। অপরাধীদের বিচার চাই।
ডাক্তাররা ময়নাতদন্ত করেননি : শহীদ ইসমামুল হকের ভাইয়ের জবানবন্দি
সাক্ষীর জবানবন্দিতে শহীদ ইসমামুল হকের বড় ভাই মহিবুল হক ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয় ইসমামুল হককে (১৭)। আমি চট্টগ্রামের বাড়িতে ছিলাম। (২০২৪ সালের) ৫ আগস্ট দুপুর ১টার দিকে আমার ভাই ইসমামুলের মোবাইল ফোন থেকে জনৈক ব্যক্তি কল করে জানান, আমার ভাই পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি আছে। ইসমামুল চকবাজার গফুর সওদাগরের দোকানে কাজ করত। পরিবহণ চলাচল বন্ধ থাকায় আমরা সেদিন ঢাকায় পৌঁছতে পারিনি। পরদিন সকালে আম্মা ও দুই আত্মীয়কে নিয়ে ঢাকায় আসি। ৭ আগস্ট অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সেদিন বিকেল ৪টার দিকে আমার ভাই মারা যায়। তার ময়নাতদন্ত হয়নি। কারণ, ডাক্তাররা ময়নাতদন্ত করেননি। পরে আমরা ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে ইসমামুলের লাশ চট্টগ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাই। পরদিন দুবার জানাজা শেষে তাকে নিজ গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক