ফুরফুরে মেজাজে বিএনপি, ধানের শীষের দুর্গে আঘাত হানতে চায় এনসিপি
ঢাকা-১৯ (সাভার) নির্বাচনি আসনটি এক অর্থে এখন ফাঁকা ময়দান। নেই কোনো হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস কিংবা সমান প্রতিদ্বন্দ্বী। আপাতদৃষ্টিতে অনেকটা ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার মতো ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে বিএনপি। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন ও নতুন ভোটারদের মনোভাব ধানের শীষের জন্য প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির দীর্ঘদিনের এই দুর্গে আঘাত হানতে চাইছে। এই সমীকরণকে হালকাভাবে নিচ্ছে না বিএনপিও, বরং প্রতিদ্বন্দ্বীকে শক্তিশালী ভেবেই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে পুরো শক্তিতে নির্বাচনি মাঠ কাঁপাচ্ছে তারা।
দীর্ঘদিন ভোটের মাঠ প্রস্তুত করা জামায়াত শেষ মুহূর্তে এনসিপির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছে ভোটের মাঠ থেকে। ব্যালট পেপারে নেই দাঁড়িপাল্লা।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সাত প্রার্থী। কেউ দাঁড়িয়েছেন শখে, কেউ বরাবরের মতোই। আবার দু'একজন কেন দাঁড়িয়েছেন- তাও জানে না খোদ ভোটাররা। সব মিলিয়ে শেষ মেষ ভোট হচ্ছে মূলত ধানের শীষ আর জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতীক শাপলা কলির মধ্যে। বিগত চারটি নির্বাচনে নিজস্ব প্রভাব ও বলয় গড়ে তোলা আওয়ামী লীগের নেতারা পলাতক। মাঠ ছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ এই সংগঠনের কর্মিরাও। শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে তাই তেমন আমেজ নেই নির্বাচনের।
বিএনপির দুর্গ বলে পরিচিত এই আসনে এনসিপির প্রার্থী অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী উন্নয়ন কর্মী দিলশানা পারুল তৃণমূলের ভোটারদের অনেকের কাছে অপরিচিত।
তাকে লড়াই করতে হচ্ছে দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপির সহপরিবার কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুর বিরুদ্ধে।
তৃণমূলের বিএনপি সাংগঠনিক ভিত সঙ্গে শক্তিশালী কর্মী বাহিনীর বিপরীতে রাজনীতিতে আনকোরা এনসিসির এই প্রার্থীকে জামায়াতের ঘাড়ে পা রেখেই হাঁটতে হচ্ছে ভোটের মাঠে।
এখানেও বিপত্তি। জামায়াত নিজেই কোনো নারীকে প্রার্থী করেনি। তাই সেই দলের নেতাকর্মীদের অনেকেই একজন নারীর পেছনে ভোট প্রার্থনার বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, আবার দলীয় পছন্দের প্রার্থীকে বসিয়ে দেওয়াতেও হতাশ একাংশ। তা সত্ত্বেও কেন্দ্রের নির্দেশ আর জোটের স্বার্থেই শাপলা কলির হয়ে ভোট চাইছেন জামায়াতের অনিচ্ছুক নেতা কর্মীরা।
এসব বিষয় সরাসরি মুখ ফুটে কিছু না বললেও অনেকটাই বেকায়দায় সাভারের প্রথম নারী প্রার্থী দিলশানা পারুল। ‘কুল রাখি না শ্যাম রাখি’ অবস্থা তার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, প্রগতিশীল ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এই উন্নয়ন কর্মীকে ভোটার টানতে বেশভূষায় আনতে হয়েছে পরিবর্তন। কখনো হিজাব, কখনো বা গলায় স্কার্ফ কখনো বা ঐতিহ্যবাহী আরব্য পোশাক চেকার্ড প্যাটার্নের কেফিয়াহ আবৃত হয়েই দিলশানা পারুল চষে বেড়াচ্ছেন এক এলাকা থেকে আরেক এলাকা।
কেবল অভিজ্ঞতা আর বয়সই নয় আর্থিক অক্ষমতাও অসম করে তুলেছে শাপলা প্রতীকের প্রার্থীকে।
নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া হলফ নামায় বিএনপির প্রার্থী ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুর হাতেই নগদ রয়েছে তিন কোটি ২০ লাখ ২৮ হাজার টাকা, যা ঢাকার ২০ প্রার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ। আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন মির্জা আব্বাস।
অথচ দিলশানা পারুলের হাতে নগদ অর্থ দেখিয়েছেন মাত্র ৯ লাখ ১৮ হাজার ৭৫৫ টাকা। আর্থিক ঘাটতি মেটাতে তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে গণ অর্থায়নের ওপর। অর্থের তেমন প্রবাহ না থাকায় নিরুত্তাপ ভোটের মাঠ। তাই নির্বাচন ঘিরেও চোখে পড়েনি ভোটারদের বাড়তি কোনো আগ্ৰহ বা উন্মাদনা।
ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার শিমুলিয়া, ধামসোনা, ইয়ারপুর, আশুলিয়া, বিরুলিয়া, পাথালিয়া, সাভার ইউনিয়ন, সাভার পৌরসভা ও সাভার সেনানিবাস এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবারের নির্বাচনে ঢাকা-১৯ আসন থেকে মোট প্রার্থী হয়েছিলেন ৯ জন। তাঁদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আফজাল হোসাইন ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থী একেএম এনামুল হক প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে কাগজে কলমে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা সাত। তবে মাঠের লড়াইয়ে অর্ধেকের বেশি প্রার্থীই নিষ্ক্রিয়। এদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু, এনসিপির দিলশানা পারুল সেই অর্থে প্রচারণার এগিয়ে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা অন্য প্রার্থীরা হলেন- লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সাবেক সেনা কর্মকর্তা চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, জাতীয় পার্টির বাহাদুর ইসলাম, গণ অধিকার পরিষদের শেখ শওকত হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ ফারুক খান ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ইসরাফিল হোসেন সাভারী।
ভোটার সংখ্যার দিক থেকে ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বড় এই আসন। সাত লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেক তিন লাখ ৬৭ হাজার ১৫১ জনই নারী। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৩ জন। ২৭৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৮টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় স্পষ্ট হচ্ছে ভোটের জটিল সমীকরণ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। তাদের ভোট যেমন একটি বড় ফ্যাক্টর তেমনি ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি’র ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে জামায়াতের ভোটের বৃত্ত ভেঙে জুলাই অভ্যুত্থানের জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল এনসিপি কতটা প্রভাব সৃষ্টি করে- সেই উত্তর পেতেই অপেক্ষা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন।

জাহিদুর রহমান