প্রচারণার শেষ সময়েও অভিযোগের চাপ ইসিতে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর মাত্র দুদিন বাকি। আগামীকাল মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে সাতটা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণা শেষ হচ্ছে। তবে শেষ সময়েও নির্বাচন কমিশনে (ইসি) অভিযোগের স্তূপ জমা পড়ছে। সোমবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী পৃথকভাবে সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের উদ্বেগ ও অভিযোগ জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ইসিও বসে নেই। নির্বাচনে সারা দেশের নির্বাহী হাকিমরা ৪৬১টি নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ করার অভিযোগে ২৫৯টি মামলা দায়ের ও ৩২ লাখ ১৫ হাজার ৯৫০ টাকা জরিমানা করেছেন। গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্যসচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, গত ৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ ৩৩টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১৩টি মামলার বিপরীতে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় জোটটির পক্ষ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, ইসির নির্দেশনা দেখলাম ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ব্যবহার বা বহন করা যাবে না। এই ধরনের ঘোষণা সবাইকে উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমরা ইসির সঙ্গে কথা বলেছি। উনারা বলেছেন, ইতোমধ্যে এটা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তবে, মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটা রেস্ট্রিকশন আছে। ভোটকেন্দ্রের ভেতরের মোবাইল ব্যবহারের একটা নির্দেশনা উনারা দেবেন। আমরা বলেছি, এই বিষয়টিও ইসির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা উচিত। কারণ ইসি বললেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা দেন। এই ধরনের ভিন্ন এক্সপ্লেনেশনের কারণে জটিলতা তৈরি হয়।
ভোটকেন্দ্রে বিএনসিসি রাখা প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে মাহবুব জুবায়ের বলেন, প্রতি ইলেকশনে বিএনসিসিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা সহযোগী ফোর্স হিসেবে কাজ করেন। উনারা বলেছেন যে এই ব্যাপারে আরপিওতে কিছু বিধিবদ্ধ বিষয় আছে। তারপরেও চূড়ান্তভাবে উনারা করেন নাই। এটাকে কীভাবে সমন্বয় করা যায় তারা বিষয়টি ভাববেন। আমরা বলেছি যে, এবারের নির্বাচন যেহেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণভোট এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে হচ্ছে। যেহেতু জনগণের ভোট দিতে সময় বেশি লাগবে এবং গত তিনটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারার কারণে মানুষের স্বাভাবিকভাবে আবেগ আগ্রহ এবং উৎসাহ বেশি থাকবে। এজন্য যত বেশি পারা যায় সাপোর্টিং এ সমস্ত ফোর্সগুলোকে দেওয়া উচিত। যাতে সুন্দর শান্তিপূর্ণ নির্বাচনটা নিশ্চিত হয়। এ ব্যাপারে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছে জানিয়ে এ জামায়াতনেতা বলেন, খুলনার ডিআইজি, নাটোর ও শরীয়তপুরের এসপিসহ কয়েকজনের কথা তাদের বলেছি। আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের পক্ষ থেকে যে ভূমিকা রাখা হচ্ছে, সেটা কোন অবস্থায় একটি সুষ্ঠ সুন্দর গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য অনুকূল নয়। এদেরকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং প্রয়োজনে এদেরকে প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায় এ সমস্ত এলাকাগুলোসহ আরো কয়েকটি এলাকাতে নির্বাচন সুষ্ঠ হবে না।
এ সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, নির্বাচন কমিশন কিছু কার্যক্রম আমাদের মনে হয় ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে করেন। যেমন একটি দলের দাবির প্রেক্ষিতে বিএনসিসিকে কেন্দ্রে না রাখার বিষয়ে এক ধরনের কথা শুনেছিলাম।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, প্রশাসনিক রদবদল স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষভাবে হওয়ার কথা ছিল। আমরা দেখছি, একটি দলকে হয়তো একটু বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট দলের প্রার্থী অভিযোগ করলে সঙ্গে সঙ্গে অফিসার উইথড্র হয়ে যাচ্ছেন। কিছু জায়গায় দেখেছি, নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অস্বাভাবিক আচরণ করছেন এবং তারা অনেক ক্ষেত্রে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন বা নির্দিষ্ট কোনো দলে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করছেন। বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপকে তারা কল দিচ্ছেন। তার প্রেক্ষিতে আমরা নির্বাচন কমিশনকে ইতোমধ্যে কিছু স্পেসিফিক অফিসারদের অপসারণ এবং পরিবর্তনের বিষয়ে বলেছি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, যখন আমাদের প্রার্থীরা বিভিন্ন অফিসারদের বিষয়ে ইসিতে লিখিতভাবে অভিযোগ করছেন, সেটির রিপ্লাই পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের ভোটার বা নির্বাচনের কর্মী যারা আছেন, বিশেষ করে নারী কর্মীদের ওপর রিপিটেডলি হামলা হচ্ছে। তাদের সাইবার বুলিং করা হচ্ছে, ফিজিক্যালি ইনসাল্ট করা হচ্ছে। এই সমস্ত আসনগুলোর ব্যাপারে আমরা বলছি যে উনাদের স্পেসিফিক এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা উচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া উচিত।
সিইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ফজলে বারী মাসুদ বলেছেন, চারশো গজের মধ্যে মোবাইল নেয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়েছে। এটি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অংশ হতে পারে। একটি দল জাল ভোট দিতে গিয়ে সিলসহ ধরা পড়েছে। এটি নিয়ে ইসিকে শঙ্কা জানাই। নির্বাচনি আচরণবিধি আমাদের দল পালন করেছে। অন্য রাজনৈতিক দল সেটি অনুসরণ করেনি।
অন্যদিকে সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে নির্বাচনি আমেজ নষ্টের অপপ্রয়াস দেখতে পাওয়ার দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভিপি সাদিক কয়েম। সোমবার সাদিক কায়েম বলেন, বাংলাদেশের ৪ কোটি তরুণ ভোটাররা আছেন, তাদের কথাগুলো বলতে এসেছি। গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে যারা তরুণরা আছেন, যারা ১৮ বছর থেকে ২৫ বছরের, আমরা ভোট দিতে পারি নাই। সুতরাং এ নির্বাচনটি বাংলাদেশের সকল মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্বাচন উপলক্ষে ইতোমধ্যে দেখতে পেয়েছেন বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গ মাইল জুড়ে একটা আমেজ তৈরি হয়েছে। সে আমেজকে নষ্ট করার জন্য বিভিন্ন ধরনের অপপ্রয়াস ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেই ষড়যন্ত্র এবং অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে আমাদের কনসার্নগুলো জানানোর জন্য এসেছি।
সিইসির সঙ্গে দেখা করে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নির্বাচনে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ এবং উদ্দীপনা দেখা যায়, তা রাস্তাঘাটে অনুভব করতে পারছি না। আমাদের দল এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তবে যার কাছ থেকে রাজনীতি শিখেছি, আমার বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে দাঁড়িয়েছেন। আমরা তাকে সমর্থন করেছি এবং নির্বাচনি প্রচারণায় যা করা দরকার তা চেষ্টা করেছি। কিন্তু রাস্তাঘাটে মানুষের উৎসাহ খুবই কম। নির্বাচনে কোথাও জামায়াত এবং কোথাও বিএনপি খুবই শক্তি খাটাবার চেষ্টা করেছে।’
কাদের সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, টাঙ্গাইলে কিছু নির্বাচনি এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা রাতের আঁধারে মানুষের ঘর ভেঙে গ্রেপ্তার করছে। নির্বাচন কমিশন তার অভিযোগ শুনেছেন। এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নিজস্ব প্রতিবেদক