নির্বাচনে নিরাপত্তার দায়িত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য
ভোটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দেশ। বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে সারা দেশে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত নজরদারিসহ সব দিক থেকেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ বলে জানিয়েছে কমিশন। নির্বাচন কমিশনের দাবি, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার বেশি সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ভবনে আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, বর্তমানে বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। তবে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব ঘটনা না ঘটলে পরিবেশ আরও সুসংহত হতো।
নির্বাচন কমিশনার মো. সানাউল্লাহ বলেন, আগামী ১২ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। তবে নির্ধারিত সময় শেষে কেন্দ্রের চৌহদ্দির মধ্যে ভোটার উপস্থিত থাকলে তাদের ভোটগ্রহণ করা হবে। ৩০০ আসনের মধ্যে শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত থাকছে। ফলে ২৯৯ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একযোগে অনুষ্ঠিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবার নির্বাচনে ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন, এরমধ্যে স্বতন্ত্র ২৭৩ জন, দলীয় ১ হাজার ৭৫৫ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী ৮৩ জন।
ইসি সানাউল্লাহ জানান, সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৬৫৯টি কেন্দ্রে সশরীরে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোট গণনা করা হবে। সব মিলিয়ে মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৯৫৮টি। ইন-পার্সন ভোটিংয়ের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘সাধারণ’ এবং বাকি ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ এবং নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ।
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে সারা দেশে ৮৫০টির বেশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার প্রমাণ। তিনি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৩০ জন দেশীয় পর্যবেক্ষক এবং প্রায় ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক। এ ছাড়া প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জন সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন, যার মধ্যে বিদেশি সাংবাদিক রয়েছেন প্রায় ১৫৬ জন।
আইনশৃঙ্খলা ও প্রযুক্তি
নির্বাচনের নিরাপত্তায় সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় ২ হাজার ১০০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচনে ড্রোন (ইউএভি), বডি ওর্ন ক্যামেরা ও ব্যাপকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসি জানিয়েছে, ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভোট গণনা ও ফলাফল
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুটি ব্যালট একইসঙ্গে গণনা করা হবে। কেন্দ্র পর্যায়ে প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর তা রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। বেশিরভাগ আসনের ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আশা করছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, এই পর্যন্ত যে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আছে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। যে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো ঘটেছে এগুলো না ঘটলে আরও ভালো হতো। অতীতে যেকোনো সময় চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির ব্যাপারে যদি আমি বলি সারা দেশে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ডেপ্লয় (মোতায়েন) হয়েছে পুরা দেশব্যাপী।
ভোটের মাঠে আইনশৃঙ্খলা পরিবেশের বিষয়ে সন্তুষ প্রকাশ করে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রথমবারের মতো এবার ইউএভি আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল ব্যবহার করা হচ্ছে। ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরা দেশেই এটা বিস্তৃত থাকবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনার ওভারল্যাপ থাকবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটা ফ্যাসিলিটি একখানে থাকবে, আরেকটা এখানে থাকবে না। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
ভোটার ও প্রার্থীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, সমর্থক সবার প্রতি আহ্বান—আমরা যেন এই সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখি। যেসব জায়গাতে কিছুটা হলেও এখনও পর্যন্ত টেনশন (উত্তেজনা) বিরাজমান সেগুলো যেন আর আমরা কন্টিনিউ (অব্যাহত) না করি। সুন্দর সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে উৎসবমুখর পরিবেশে আমাদের অতি প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করি।
ভোটের হার কেমন হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে সানাউল্লাহ বলেন, আমরা তো কোন স্পেকুলেশন করতে চাচ্ছি না। তবে আমরা ধারণা করি, ইনশআল্লাহ আমরা যে ফিডব্যাক পেয়েছি—মানুষের মধ্যে যে উৎসব ভোটার টার্ন-আউট ভালো হবে। ভোটারদের প্রস্তুতি উচ্ছ্বাস দেখছি। শুধু আজ ঢাকার ট্রেনের দিকে তাকিয়ে দেখেন, কী পরিমাণ মানুষ বাড়িতে যাচ্ছে শুধু ভোট দেওয়ার জন্য। সব দিকে উৎসবে পরিণত হয়েছে। ভোটারদের উপস্থিতি উচ্ছ্বাস রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা এবং তাদের সচেতনতা নির্বাচনে ইতোপূর্বে বাংলাদেশে এত ফোর্স, এত ক্যাপাসিটি ডেপ্লয় কখনোই করা হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে আমি মনে করি, পরিবেশ ভালো। আশা করি, অনুশীলনটা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হোক।

নিজস্ব প্রতিবেদক