এলেন, দেখলেন, জয় করলেন
‘জীবনে কী ঘটেছে, তা গুরুত্ব রাখে না। গুরুত্ব রাখে আপনি কী মনে রেখেছেন, কীভাবে মনে রেখেছেন’— গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শুরু করার কারণটা বলা যাক। মার্কেজ অমর হয়ে আছেন তার কালজয়ী উপন্যাস ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ এর জন্য। তারেক রহমানের জন্য ১৭ বছর কোনো অংশেই একশ বছরের চেয়ে কম ছিল না। তিনি নিঃসঙ্গই ছিলেন। সব থেকেও কিছুই ছিল না।
জীবন আসলে থেমে থাকে না। সব দুঃখের অবসান ঘটে। নিঃসঙ্গতার দিনগুলোতে তিনি হয়তো অপেক্ষায় ছিলেন সঠিক সময়ের। সময়টা এলো। তিনিও এলেন। এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। অনেকটা জুলিয়াস সিজারের সেই উক্তির মতো। প্রায় দু’হাজার বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭ অব্দ) সিজার এশিয়া মাইনরে চার ঘণ্টার কম সময়ে পন্টুস রাজ্য জয় করে রোমান সিনেটে তিন শব্দের বার্তা পাঠান। তিনটি শব্দ কালের পাতায় চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও কালের পাতায় নিজের জায়গাটা অমর করেছেন। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান সবসময়ই জাগ্রত চরিত্র হয়ে ছিলেন। অধিকাংশ সময় নেতিবাচকভাবে খবরের শিরোনাম হওয়া তারেক রহমান এখনও শিরোনামে, তবে পুরোটাজুড়ে বীরত্বের চর্চা। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে যে উপন্যাসের শুরু, তার প্রথম অধ্যায় ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচন। বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি, তারেক রহমান জিতেছেন ঢাকা-বগুড়া উভয় আসনে। কোনো প্রহসনের ভোট নয়, সাজানো নির্বাচন নয়, জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলাফল বিএনপির এই বিজয়।
‘পথহীন অরণ্যে এক নিবিড় আনন্দ আছে। অতল সাগরের তীরে আছে এমন এক সমাজ, যেখানে কারো নেই প্রবেশ। আর তার উত্তাল গর্জনে আছে সংগীতের এক মায়াবী রেশ’—বিখ্যাত ব্রিটিশ কবি লর্ড বায়রন বলেছিলেন কথাগুলো। ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনে তারেক রহমান লন্ডনের অলিগলি ঘুরে উপলব্ধি করেছেন জীবনের নির্মমতা। ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র পেয়েছেন। যে মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দেশের মাটিতে পা রাখেন গত ডিসেম্বরে। কিন্তু, তার গল্প অত মসৃণ হলে হবে কী করে! দেশে ফিরে হারালেন মা খালেদা জিয়াকে। ৩০ ডিসেম্বর অবসান ঘটে রাজনীতির এক মহান অধ্যায়ের। যার প্রয়াণে কেঁদেছে গোটা বাংলা। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তারেক রহমান প্রত্যয় নিলেন নতুন বাংলাদেশ গড়ার। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে হলেন চেয়ারম্যান। জিতলেন নির্বাচনে। নির্বাচনে বিজয় আগামীর দেশ গড়ার প্রথম সিঁড়িতে পদার্পন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান খুলে দেয় বন্ধ দরজা। ১৬ মাসের অপেক্ষা, শঙ্কা, উৎকণ্ঠা কাটিয়ে ১৭ বছর পর তারেক রহমান যেদিন দেশে ফিরলেন, ঢাকার ৩০০ ফিট লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। তাকে দেখতে মহাসমুদ্রে পরিণত হয় ঢাকা। মানুষের মাঝে মিশে গিয়ে মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’- এর আদলে ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’-এর ঘোষণা দেন। লুথার কিং ছিলেন বিশ্বজুড়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অনন্য প্রতীক। কী কাকতাল! বাংলার মানুষ নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে তারেক রহমানকেই নেতা ভেবেছে। আপন করে নিয়েছে আবালবৃদ্ধবনিতা ।
মায়ের জানাজায় তারেক রহমান কথা বলেছেন সন্তান হিসেবে। কোনো রাজনৈতিক নেতার পরিচয়ে নয়। ১৭ বছরের নির্বাসনে নিজেকে আতশকাঁচের নিচে ফেলেছেন বারবার, বোঝা গিয়েছে ফেরার পর তার একেকটা ভাষণে। বাবা জিয়াউর রহমান, মা খালেদা জিয়া আপাদমস্তক বাংলা ও বাঙালির ছিলেন। তাদের শূন্যতা হয়তো সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু, তারেক রহমান আশা দেখাচ্ছেন। অনেকটা পরিণত, শাণিত, ক্ষুরধার একজন রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার গুণ তার মাঝে ফুটে উঠছে।
নির্বাচনের সময়টায় দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চষে বেড়িয়েছেন। দিন থেকে রাত যেখানেই সমাবেশ করেছেন, জনসমুদ্র হয়েছে। তারেক রহমান তা-ই বলেছেন, মানুষ যা শুনতে চেয়েছে। একেকটা সমাবেশ করেছেন, সমর্থকদের আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। ১৯ দিনে ৬৪টি জনসভা করেছেন। নেতা হিসেবে নয়, জনতার দূত হিসেবে। কখনও দর্শকসারি থেকে সাধারণ মানুষকে ডেকে মঞ্চে এনেছেন তারেক রহমান। কখনও তার কাছে ছুটে এসেছেন ভক্ত। চলতি পথে হাসিমুখে ছবি তুলেছেন সবার সঙ্গে। কথা বলেছেন, কথা শুনেছেন। ঠিক যেন পাশের বাড়ির ছেলেটা।
রাজনীতিতে দেখা যায়, নির্দিষ্ট সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে আন্তরিকতা থাকে না। তারেক রহমানও প্রতিপক্ষের কথার বাণে জর্জর হয়েছেন, তবে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে ঢের কম। ওই যে সবার আগে বাংলাদেশ। তার অভিধানে হাল ছাড়ার কথা লেখা নেই। বরং ফুল ফুটিয়েছেন। শীতের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে বসন্ত এসেছে। প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতে যাওয়া তারেক রহমান এখন বলতেই পারেন–ফুল ফুটুক, না ফুটুক, আজ বসন্ত।

জহিরুল কাইউম ফিরোজ