নাব্য সংকটে তিন মাস বন্ধ ফরিদপুরের নৌবন্দর
ফরিদপুরের পদ্মা পাড়ের মানুষের কাছে এবারের দৃশ্য একেবারেই অচেনা। এমন পদ্মা তারা আগে কখনও দেখেছেন বলে মনে করতে পারছেন না। শীতের শুরুতেই পানি কমে গিয়ে এখন পুরো নদীজুড়ে যেন হাহাকার। মাঝনদীতে জেগে ওঠা চরগুলো দূর থেকে ধূসর মরুভূমির মতো দেখায়। অবলীলায় পায়ে হেঁটে পদ্মা পার হওয়ার দৃশ্য এ অঞ্চলে যেন এক নতুন বাস্তবতা।
শীত মৌসুমের শুরু থেকেই ফরিদপুরের পদ্মা নদীতে তীব্র নাব্য সংকট দেখা দেয়। গত প্রায় তিন মাস ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ফরিদপুর সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম। দক্ষিণাঞ্চলসহ বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ এই নৌবন্দরটি এখন প্রায় অচল। নদীর বুকে জেগে ওঠা অসংখ্য ছোট-বড় ডুবোচর এবং পানি শূন্যতার কারণে পণ্যবাহী জাহাজ, কার্গো ও বড় ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। দূরদূরান্ত থেকে পণ্য নিয়ে আসা জাহাজগুলো মাঝপথে চরে আটকা পড়ছে। ফলে তারা ঘাটে ভিড়তে পারছে না। এতে হাজারের বেশি কুলি-শ্রমিক ও ব্যবসায়ীর জীবন-জীবিকা থমকে গেছে।
ঘাট সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সিএন্ডবি ঘাট শত বছরের পুরোনো হলেও ২০১৫ সালে এটি সরকারিভাবে পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত এই বন্দর দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পণ্য পরিবহণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরবর্তীতে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির বন্দরে উন্নীত হয়। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর এবং সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপনে এই বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় বছরের একটি বড় সময় বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর প্রভাব শুধু বন্দরের শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের ওপর নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ে। ফরিদপুরের সোনালি আঁশ খ্যাত পাট এই বন্দর হয়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রপ্তানি হয়। এছাড়া সিলেট থেকে কয়লা ও বালু, নারায়ণগঞ্জ থেকে সিমেন্টবাহী জাহাজ, ভারতের গরু ও চালসহ চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও মিরকাদিম থেকে চাল আমদানি এই নৌপথেই হয়ে থাকে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে এই নৌবন্দর থেকে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। কিন্তু ডুবোচর ও নাব্যতা সংকটের কারণে চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রাজস্ব বাড়ছে না। বর্তমানে ঘাট থেকে রাজস্ব আদায় করছে বিআইডব্লিউটিএ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য নৌবন্দরটি ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান ইজারাদার মজিবুর রহমান দাবি করেছেন, প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ক্ষতির মুখে পড়ছেন তিনি। গত তিন মাসে তিনি বিআইডব্লিউটিএর কাছে ২৫টি চিঠি দিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং নদীর মধ্যে একটি ড্রেজার মেশিন ফেলে রাখায় চলাচলে আরও সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নৌবন্দরের শ্রমিক লালন বলেন, জাহাজ ভিড়তে না পারায় বেকার হয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। তার বাড়ি নওগাঁ। প্রতিদিন কাজ না থাকায় নিজের খাওয়া-দাওয়ার সমস্যার পাশাপাশি বাড়িতে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারছেন না। দ্রুত ড্রেজিংয়ের দাবি জানান তিনি।
শ্রমিক নুরুল শেখ বলেন, এই কাজের ওপরই তার সংসার চলে। দুই সন্তান পড়ালেখা করে। জাহাজ না আসায় আয় কমে গেছে, সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক সময় বাড়ি থেকে টাকা এনে চলতে হচ্ছে।
রমজান নামে আরেক কুলি জানান, তিন মাস ধরে একেবারে বেকার। ঘাটই তাদের একমাত্র আয়ের জায়গা। দ্রুত ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
ঘাটের বড় ব্যবসায়ী আলম শেখ বলেন, দক্ষিণবঙ্গসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের ব্যবসায়িক পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য এই নৌবন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত তিন মাসে শুধু তারই ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। দ্রুত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করার দাবি জানান তিনি।
ব্যবসায়ী ও ইজারাদার মুজিবর শেখ বলেন, নাব্য সংকট ও চর জেগে ওঠায় পণ্যবাহী নৌযান বন্দরে আসতে পারছে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় ইজারা নেওয়া হলেও প্রতিদিন বিপুল ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ক্ষতিপূরণ এবং দ্রুত ড্রেজিংয়ের দাবি জানান তিনি।
ফরিদপুর সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দরের বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, নাব্য সংকটের কারণে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্রুত ড্রেজিং প্রয়োজন বলে তারা স্বীকার করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরিচা নৌবন্দরের উপ-পরিচালক সুব্রত কুমার রায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান মোল্লা বলেন, নাব্য সংকটের কারণে নৌবন্দরটি চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত খননকাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নির্বাচনি ব্যস্ততার কারণে বিলম্ব হয়ে থাকতে পারে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক জানান, যেসব স্থানে চর সৃষ্টি হয়েছে সেখানে ড্রেজার বসিয়ে খননের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিআইডব্লিউটিএ বিষয়টি দেখছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সঞ্জিব দাস, ফরিদপুর