সেতুটি ভেঙেছে ১৭ বছর আগে, নতুন সেতু হবে কবে?
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের জামতলাপাড়া থেকে কচুয়ারপাড়া-মাদাইখাল সংযোগ সড়কে ডুবুরিরখাল এখন আর শুধু একটি খাল নয়, এটি দুই পাড়ের মানুষের বিচ্ছিন্ন জীবনের প্রতীক। একসময় যেখানে একটি সেতুর মাধ্যমে দুপাড়ের মানুষের মধ্যে সহজ যোগাযোগ ছিল, এখন সেখানে দেখা যায় কেবল ভাঙা কংক্রিটের চিহ্ন।
প্রায় দেড় দশক আগে ধ্বসে পড়া সেতুটির জায়গায় আজও নতুন কোনো স্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়নি। ভাঙা সেতুর উপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে সাময়িকভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন স্থানীয়রা। ফলে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন। শিশুদের স্কুল, কৃষকের ফসল পরিবহণ, রোগীর হাসপাতালে যাওয়া—সবকিছুই এখন একটি অস্থায়ী কাঠের পথের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি উদ্যোগ না থাকায় গ্রামবাসী ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় ভাঙা সেতুর ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে সাময়িক চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। শুরুতে সেটি কিছুটা স্বস্তি দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠ ক্ষয়ে গেছে, পাটাতন ঢিলা হয়ে গেছে, অনেক জায়গায় ফাঁক তৈরি হয়েছে। এখন সেটিই হয়ে উঠেছে নতুন ঝুঁকির কারণ।
জানা গেছে, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ডুবুরিরখালের ওপর আগে পরপর দুটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বল্প বাজেট ও নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই বন্যার তীব্র স্রোতে সেগুলো দেবে যায়। সর্বশেষ ২০০৬ সালে নির্মিত সেতুটি ২০০৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময়, কিন্তু সেতু পুনর্নির্মাণে আর কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
জানতে চাইলে স্থানীয়দের নিত্যকার ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাসেম আলী। তিনি বলেন, ‘সেতুটি দিয়ে ঠিকমতো হাঁটাও যায় না। অসুস্থ রোগী বা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিতে হলে কয়েক কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। অটোরিকশা চলাচল করতে পারে না। কাঁচামাল, সার, ধানচাল পরিবহণে আমাদের চরম ভোগান্তি হচ্ছে।’
বর্ষা এলে ভয় আরও বাড়ে বলে জানান কৃষক রমেশ চন্দ্র। তিনি বলেন, ‘বন্যার সময় কাঠের পাটাতনটি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এমন দশা হয় যে যেকোনো সময় উল্টে যাবে বলে মনে হয়। ছেলেমেয়েরা কষ্ট করে এই পাটাতন পেরিয়েই স্কুলে যায়। একটি স্থায়ী সেতু হলে আমাদের দুর্ভোগ অনেক কমে যাবে।’
সন্তানদের শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকরাও উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় পা ফসকে খালে পড়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে ভোর ও সন্ধ্যার সময় পাটাতন পার হওয়া আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি বলেন, ‘২০০৬ সালে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বল্প বাজেট ও নিম্নমানের কাজের কারণে বন্যায় ভেঙে পড়ে। এখানে একটি টেকসই গার্ডার সেতুর প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়েছে।’
চেয়ারম্যান শফিউল আরও জানান, বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তোলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এলাকাবাসীর দাবি, ধ্বসে পড়া সেতুটি নতুনভাবে নির্মাণ করা হলে জামতলা, কচুয়ারপাড়া ও মাদাইখাল এলাকার কয়েক হাজার মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হবে। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ হবে, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত নিরাপদ হবে, আর জরুরি সেবার ক্ষেত্রে সময় নষ্ট হবে না।
ডুবুরিরখালের ওপর একটি টেকসই গার্ডার সেতু তাই এখন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের দাবি। সেতুটি ভেঙেছে বহু বছর আগে; এখন প্রশ্ন একটাই—নতুন সেতু হবে কবে?

ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)