এখনও শেষ হয়নি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ, বোরো নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা
নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে এখন সবুজের সমারোহ। কিছুদিন পরই পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার স্বপ্ন বুনছে কৃষকেরা। তবে হাওরের ফসল রক্ষায় বাঁধ সংস্কারের নির্ধারিত সময়সীমা পার হলেও প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় আগাম বন্যার ঝুঁকিতে থাকা বোরো ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে হাওর পাড়ের কৃষকরা।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এখনো বাকি রয়েছে হাওরাঞ্চলের অনেক স্থানে মাটি ভরাটসহ আনুষঙ্গিক কাজ। খালিয়াজুরী উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, এখনো কাজ শেষ হয়নি। মাটির কাজই বাকি রয়ে গেছে। দূর্বা ঘাসতো লাগানোই হয়নি।
জেলার শতভাগ হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ ও কলমাকান্দা উপজেলায় এ বছর ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে বেরো আবাদ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাবিটা প্রকল্পের আওতায় চলতি অর্থবছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৪টি ছোট বড় হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পাউবোর কারিগরি সহায়তায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি’র) মাধ্যমে হাওরে প্রায় ১৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুবন্ত বাঁধ মেরামত কাজ শুরু হয়।
স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তারা অকালবন্যার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। বাঁধের কাজ পুরোপুরি মজবুত না হলে সামান্য ঢলও সামলানো কঠিন হবে।
কৃষক জয়নাল মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, বান (বাঁধ) দেয়ার কথা এক মাস আগে দেয় এক মাস পরে। বানের মাটি যদি শক্ত না হয় তাইলে অল্প বৃষ্টিতেই তা ভাইঙ্গা যাইবো। যদি আগাম বন্যা হয় তাইলেতো ফসল রক্ষা করাই কঠিন হইবো। আল্লা দয়া না করলে ফসল যাইবো, সরকারের টাকাও নষ্ট হইবো।
২০১৭ সালে নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলার হাওরের বোরো ফসল সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়ার পর স্থানীয় কৃষকদের আন্দোলনের কারণে সরকার ঠিকাদারি প্রথা বিলুপ্ত করে হাওরে কৃষকদের অংশগ্রহণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে। জেলা কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক এবং সদস্যসচিব পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্পের সার্বিক দেখভাল করেন।
একইভাবে উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পাউবোর সাবস্টেশন অফিসার-এসও কমিটিতে থাকেন। তারাই পিআইসি গঠন এবং অনুমোদন দিয়ে থাকেন।
তবে নীতিমালা অনুযায়ী, প্রকৃত কৃষক ও বাঁধের ঠিক পাশের জমির মালিককে পিআইসিতে রাখার নির্দেশনা থাকলেও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ সেটা মানা হচ্ছে না। প্রতি বছর একটি সুবিধাভোগী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী শ্রেণির কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তারা প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদন দেন বলে অভিযোগ করে আসছেন স্থানীয় কৃষকসহ হাওর আন্দোলনের নেতারা।
অনুমোদনকারীরা ব্যক্তিগত যোগাযোগ বাড়িয়ে প্রকল্পের বরাদ্দ বৃদ্ধি, অক্ষত প্রকল্পে বিপুল বরাদ্দ, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প করে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় প্রতি বছর। এ ছাড়াও কমিটিতে কোন রাজনৈতিক দলের নেতাদের না রাখার নির্দেশনা থাকলেও সেটা মানা হয় না। এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ার পেছনে বিগত নির্বাচনের অজুহাত দেখাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিআইসির সাথে সম্পৃক্ত রায়হান মিয়া জানান, হাওর এলাকায় ভেকু মেশিন আসতে চায় না। মাটিও আনতে হয় দূর থেকে। এছাড়া নির্বাচনের কারণে বাঁধের নির্মাণ কাজ দেরি হয়েছে।
হাওর বাচাঁও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোনায়েম খান বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি শেষে ১ সপ্তাহ হয়ে গেলো এখনো বাঁধের কাজ চলছে’।
বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চৈত্রের শুরুতে হঠাৎ আগাম বন্যার পানি চলে এলে কৃষকের সারা বছরের একমাত্র বোরো ফসল ফলানোর কষ্ট বিফলে যাবে। পাকা ধান কেটে আর ঘরে তুলতে পারবে না।
বাঁধের কাজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে শতভাগ হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী যেখানে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করা হয়েছে বলে জানান, উপজেলা কাবিটা স্কিম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীম। তিনি বলেন, বাঁধের মাটি ভরাটের ৯০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি ১০ শতাংশ মাটি ভরাট ও বাঁধের ওপর ঘাস লাগানোর কাজ আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই সমাপ্ত হবে।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউএনও বলেন, ‘এখানকার হাওর থেকে দেরিতে পানি সরায় প্রকল্প চিহ্নিতকরণ কাজ কিছুটা পিছিয়ে ছিল। এ কারণে নির্দিষ্ট সময় কাজ শুরু করা যায়নি। প্রকল্পের কাজ দেরিতে শুরু হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হয়নি। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ শেষ করে ফসলকে ঝুঁকিমুক্ত করার আশ্বাস দেন তিনি।
জেলা কৃষি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আমিনুল ইসলাম জানান, নেত্রকোনার ১০টি উপজেলার মধ্যে খালিয়াজুরীসহ কয়েকটি উপজেলায় ১৩৪টি হাওরে রোপণ করা হয়েছে জেলার প্রধান ফসল বোরো। জেলায় চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫ শত ৪৮ হেক্টর জমিতে। হাওরাঞ্চলে এ বছর আবাদ করা হয়েছে ৪৩ হাজার হেক্টর জমি। হাওরে পানি কমতেই শুরু হয় ইরি-বোরো আবাদের ধুম। বীজতলা তৈরী, হালচাষ, ধানের চারা রোপণ ও জমিতে সেচ দেওয়া শেষে কিছুদিন বাধে ধান পাকার পর একমাত্র বোরো ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছেন চাষীরা।
ফসল রক্ষায় হাওরের বাঁধের কাজের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। সময় বাড়িয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই ডুবন্ত বাঁধের বাকি কাজ শেষ হবে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবোর) নেত্রকোনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন।

ভজন দাস, নেত্রকোনা