তেল নিতে পাম্পের সামনে ‘ভুতুড়ে সিরিয়াল’
সাতক্ষীরায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। গভীর রাতে পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল রেখে কৃত্রিম ‘ভুতুড়ে সিরিয়াল’ তৈরি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। সিন্ডিকেটের এই দৌরাত্ম্যে জরুরি সেবার যানবাহন ও সাধারণ গ্রাহকরা তেল না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সরেজমিনে সাতক্ষীরা সদর, তালা ও কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফোটার আগেই পাম্পের সামনে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। তবে সারির শুরুর দিকের অধিকাংশ বাইকের সাথে কোনো চালক নেই। স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র আগের রাতেই ৩০ থেকে ৪০টি বাইক পাম্পের সামনে রেখে দেয়। সকালে সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়ালে সেই সিরিয়াল ২০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়। টাকা না দিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল মিলছে না।
ভুক্তভোগী রুস্তম হোসেন জানান, একই ব্যক্তি বারবার বিভিন্ন বাইক নিয়ে লাইনে ঢুকে তেল সংগ্রহ করছে এবং পরে তা বাইরে চড়া দামে বিক্রি করছে।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক হাবিবুর রহমান জানান, জরুরি রোগী দেখতে যাওয়ার তাড়া থাকলেও তেলের জন্য ৩-৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছে না, যা চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করছে। সাংবাদিক ও অ্যাম্বুলেন্স চালকরাও একই অভিযোগ করেছেন।
প্রাইভেটকার চালক সাগর হোসেন জানান, ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাম্প থেকে সংগৃহীত এই তেল ড্রাম বা বোতলে ভরে গ্রামের খুচরা দোকানগুলোতে লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দামে গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে। পাম্প মালিকরা বলছেন, তারা এই সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়।
সাতক্ষীরা শহরের দেবনগর গ্রামের মাছের খাদ্য ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক জানান, ফজরের পর লাইনে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু সামনে অন্তত ৬০টি মোটরসাইকেল রাখা ছিল, যেগুলোর কোনো চালক নেই। পরে জানতে পারি, এই সিরিয়াল ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টাকা দিলে আগে তেল পাওয়া যায়, না দিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও লাভ হয় না।
কলারোয়ার একটি ফুয়েল স্টেশনের মালিক আমজাদ হোসেন বলেন, সিন্ডিকেটের সদস্যরা দলবেঁধে এসে পাম্পে মোটরসাইকেল রেখে যায়। বাধা দিলে কর্মচারীদের মারধর করে। এমনকি দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও ট্যাগ অফিসারের সামনেও তারা ঔদ্ধত্য দেখায়। নিরাপত্তাহীনতায় আমরা আতঙ্কে রয়েছি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পাম্পে ভ্রাম্যমাণ আদালত, বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে সিন্ডিকেটের নিত্যনতুন কৌশলের কারণে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস জানান, মোটরসাইকেলভিত্তিক এই সিন্ডিকেটের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। অনিয়ম বন্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জরুরি সেবার যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কে এম আনিছুর রহমান, সাতক্ষীরা (সদর-কলারোয়া-তালা-ভোমরা স্থলবন্দর)