ভাগ্নে-দুলাভাইয়ের হাতেই চার খুন, দাবি পুলিশের
জমির ভাগবাটোয়ার সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই নওগাঁর নিয়ামতপুরের বাহাদুরপুর গ্রামে দুই শিশুসহ একই পরিবারের চারজনকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত হাবিবুর রহমানের আপন দুই ভাগ্নে আর দুলাভাইকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আজ মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। পুলিশের দাবি– এই তিনজনসহ আরও কয়েকজন এই কিলিং মিশনে অংশগ্রহণ করেছে।
গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন হলেন নিহত হাবিবুর রহমানের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম (৩০), তার ছেলে শাহিন হোসেন এবং আরেক বোন হালিমা খাতুনের ছেলে সবুজ রানা (২০)। তিনজনের বাড়িই উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, নমির উদ্দিনের এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিন তার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সম্পত্তি লিখে দেন। ১৭ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে বসতবাড়িসহ ১৩ বিঘা সম্পত্তি ছেলে হাবিবুর রহমানকে লিখে দেন। বাকি সম্পত্তি তার মেয়েদের লিখে দেন। হাবিবুর রহমানকে বেশি সম্পত্তি লিখে দেওয়ায় বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগনেদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বেশ কিছু দিন ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, হাবিবুর রহমানের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম, তার ছেলে শাহিন ও হাবিবুরের আরেক বোন হালিমা খাতুনের ছেলে সবুজ রানা হাবিবকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। গত সোমবার বিকেলে হাবিবুর তার ভাগনে সবুজ রানাকে নিয়ে এক লাখ ৪০ হাজার টাকাসহ উপজেলার ছাতড়া বাজারে গরু কিনতে যান। পরে গরু না কিনেই বাড়িতে ফিরে আসেন। বাজার থেকে ফিরে আসার পর গ্রামের একটি মাঠে গিয়ে সবুজ রানা, শহিদুল ইসলাম, শাহিনসহ ছয়জন এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাত ৮টার দিকে সবুজ রানা হাবিবুরের বাড়িতে যান। তিনি তার মামা-মামি ও মামানোত ভাই-বোনদের সঙ্গে একসাথে খাবার খান। ওই সময় সবার অগোচরে হাবিবুরের আরেক ভাগনে বাড়িতে প্রবেশ করে একটি ঘরে লুকিয়ে থাকেন। সবুজ খাবার খেয়ে বের হয়ে যান। এরপর বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে শাহিন বাড়ির মূল দরজা খুলে দিলে সবুজ, শহিদুলসহ আরও পাঁচজন বাড়িতে প্রবেশ করেন। তারা প্রথমে হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিনের ঘরে বাইরে থেকে শিকল লাগিয়ে দেন। এরপর হাবিবুর রহমানের ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় ছুরি দিয়ে গলা কেটে তাকে হত্যা করেন। হাবিবুরের স্ত্রী পপি সুলতানা দুই সন্তান নিয়ে পাশের ঘরে ছিলেন। তিনি বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসুয়া দিয়ে আঘাত করলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। এরপর তাকেও গলা কেটে হত্যা করা হয়। এরপর তাদেরর দুই সন্তান পারভেজ রহমান ও সাদিয়াকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।
এসপি আরও বলেন, মঙ্গলবার সকালে ঘটনা জানাজানি হলে সবুজ রানা, শহিদুল ও শাহিন হাবিবের বাড়িতে আসেন। তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার তদন্তে নেমে নিহত হাবিবুরের ভাগনে সবুজ, তার বাবা নমির উদ্দিন, বোন ডালিমা বেগম, হালিমাসহ ছয়-সাতজনকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ভাগনে সবুজ রানা পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে গ্রামের একটি খড়ের পালায় লুকিয়ে রাখা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাসুয়া উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া গ্রামের একটি পুকুর থেকে আজ বুধবার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আরও একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়।
এসপি আরও বলেন, পরিবারের সবাইকে হত্যার কারণ হিসেবে শহিদুল ইসলাম ও সবুজ রানা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে, নির্বংশ করলে পরবর্তী সময়ে হাবিবুর রহমানের নামে থাকা সম্পত্তির ভাগিদার তারা হবেন। এই ভাবনা থেকেই তারা পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছে।
পুলিশ সুপার জানান, হত্যাকাণ্ডের পর আটক হাবিবুরের বাবা ও দুই বোনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না পাওয়ায় মুছলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। মূলত নিরাপত্তার জন্যই তাদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম ও জয়ব্রত পাল, সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল আল মামুন শাওন, গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসিবুল্লাহ হাবিব, নিয়ামতপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
গত সোমবার দিনগত মধ্যরাতে নিয়ামতপুরে উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে এক দম্পতি ও তাদের দুই শিশু সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন, বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩৫), তার স্ত্রী পপি সুলতানা এবং তাদের সন্তান পারভেজ রহমান (৯) ও সাদিয়া আক্তার (৩)।
এদিকে, আজ বুধবার বিকেলে নিয়ামতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মরদেহগুলো উদ্ধার করে নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। এরপর রাতে পপি সুলতানার বাবা বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষকে আসামি করা হয়েছে।
ওসি মাহবুবুর রহমান জানান, আজ বুধবার দুপুরের দিকে নওগা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাদ আসর তাদের মরদেহগুলো বাহাদুরপুর গ্রামের একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ