যুক্তরাষ্ট্রে ২ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার কে এই হিশাম আবুঘরবেহ
যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে হত্যার অভিযোগে জামিলের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার এক সপ্তাহ পর একজনের মরদেহ উদ্ধার ও অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া রক্তের নমুনার ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গত ১৬ এপ্রিল সকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছ থেকেই শেষবার দেখা গিয়েছিল জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে। ১৭ এপ্রিল এক পারিবারিক বন্ধু তাদের নিখোঁজ হওয়ার খবর দিলে তদন্তে নামে পুলিশ। দীর্ঘ তল্লাশির পর স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড সেতু থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তবে নাহিদা বৃষ্টি এখনো নিখোঁজ। তদন্তকারীরা বৃষ্টির পরিবারকে জানিয়েছেন, লিমনের ও সন্দেহভাজনের যৌথ অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া রক্তের পরিমাণের ভিত্তিতে তারা নিশ্চিত যে, বৃষ্টিকেও হত্যা করা হয়েছে। বৃষ্টির সন্ধানে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছে পানিতে ডুবরি দল তল্লাশি চালাচ্ছে।
কে এই সন্দেহভাজন হিশাম আবুঘরবেহ?
অভিযুক্ত হিশাম আবুঘরবেহ (২৬) সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। তিনি ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সেখানে ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গ্রেপ্তারের আগে তাকে দুবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
আদালতের নথি অনুযায়ী, হিশাম কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী ছিলেন না, বরং তার ছিল সহিংস অপরাধের ইতিহাস। ২০২৩ সালে নিজের মা ও ভাইয়ের ওপর হামলার অভিযোগে তিনি দুইবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
হিশামের ভাই তার বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেছিলেন, কারণ হিশাম পরিবারের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়, কিন্তু তার ভাই বারবার সতর্ক করেছিলেন যে, তিনি হিশামের ফিরে আসার ঝুঁকি নিতে চান না।
গত শুক্রবার সকালে হিশামকে যখন তার পারিবারিক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন তিনি নিজেকে ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সোয়াট টিম ও বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে তাকে বের করে আনে। গ্রেপ্তারের সময় তাকে হাত ওপরে তুলে ও কোমরে তোয়ালে বাঁধা অবস্থায় বেরিয়ে আসতে দেখা যায়।
হিশামের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ পূর্বপরিকল্পিত হত্যার দুটি প্রধান অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে মরদেহ সরানো, মৃত্যুর খবর গোপন করা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা ও মারধরের অভিযোগ রয়েছে।
স্টেট অ্যাটর্নির মুখপাত্র এরিন ম্যালোনির মতে, হিশাম সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ও বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখার জন্য আবেদন করা হবে। আগামী ২৮ এপ্রিল এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
নিহত জামিল লিমন ছিলেন একজন প্রতিভাবান গবেষক। তিনি দক্ষিণ ফ্লোরিডার জলাভূমি পর্যবেক্ষণে ‘জেনারেটিভ এআই’-এর ব্যবহার নিয়ে পিএইচডি থিসিসের কাজ করছিলেন। লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ জানান, লিমনের স্বপ্ন ছিল পিএইচডি শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়া।
অন্যদিকে, নাহিদা বৃষ্টি গত বছর রাসায়নিক প্রকৌশলে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছিলেন। লিমনের ভাই জানান, লিমন সব সময় বৃষ্টির খুব প্রশংসা করতেন। তারা বিয়ের ব্যাপারে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। লিমন তার পরিবারকে জানিয়েছিলেন যে, বৃষ্টি খুব ভালো গান গাইতে এবং রান্না করতে পারে।
লিমনের ভাই জুবায়ের অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমরা আসলে ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। দুজন মেধাবী শিক্ষার্থী এভাবে হুট করে গায়েব হয়ে যেতে পারে না। আমরা শুধু আমাদের ভাই-বোনের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, সেই সত্যটুকু জানতে চাই।’
সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম এই ঘটনাকে অত্যন্ত ভয়ংকর ও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই নিহত জামিলের পরিবার ও বন্ধুদের জন্য প্রার্থনা করবেন। একই সঙ্গে নাহিদার বিদেহী আত্মার শান্তির জন্যও প্রার্থনা করুন।’
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই কঠিন সময়ে শোকাহত পরিবার দুটির পাশে থাকার ও সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক