রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : কীভাবে শুরু, উৎপাদন কবে?
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের অন্তর্গত পদ্মা নদীর পাড়ে রূপপুর গ্রামে বাংলাদেশের প্রথম নির্মাণ করা হয় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশান ফেডারেশনের স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশন (রোসাটম)-এর কারিগরি সহায়তায় ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে; যা থেকে উৎপাদন হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট বেজলোড বিদ্যুৎ। এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শিল্প ও অবকাঠামোগত প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করার ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তা নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করবে। জাতীয় উন্নয়নের মেরুদণ্ড হিসেবে বিদ্যুৎ খাত স্থিতিশীল, সাশ্রয়ী, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ দাবি করে, যা অবশ্যই টেকসই প্রাথমিক জ্বালানি উৎস এবং উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের একটি সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।
ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি এন্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান অনুসারে বাংলাদেশ একটি মিশ্র জ্বালানি নীতি গ্রহণ করেছে, যা ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতা থেকে নবায়নযোগ্য শক্তি ও পারমাণবিক শক্তিসহ পরিচ্ছন্ন ও টেকসই উৎসের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই স্বপ্নের পথে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (রূপপুর এনপিপি) একটি যুগান্তকারী প্রকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যা ১৯৬১ সালে প্রথম প্রস্তাবিত দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন থেকে প্রায় বাস্তবে রূপান্তরিত হচ্ছে। ২,৪০০ মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্য, কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নির্মিতব্য রূপপুর এনপিপি বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক শক্তিধর জাতিগুলোর কাতারে শামিল করছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বপ্ন বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের। এটি প্রথম প্রস্তাবিত হয় ১৯৬১ সালে এবং বারোটি সম্ভাব্য স্থান মূল্যায়নের পর ১৯৬২ সালে এর স্থান নির্বাচন করা হয়। প্রাথমিক সমীক্ষায় এর সম্ভাব্যতা নিশ্চিত হলেও, নানাবিধ কারণে কয়েক দশক ধরে এর অগ্রগতি ধীর গতিতে চলে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেই বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমৃদ্ধ দেশের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে ফরাসি সোফরাটম (Sofratom) এর ফিজিবিলিটি স্টাডি হলেও আরম্ভিক ১২৫ মেগাওয়াট প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৮১ সালে আইএনএসটি (INST) গঠিত হলে পারমাণবিক গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ শুরু করে। ১৯৮৬ সালে সাভারে ৩ মেগাওয়াট ট্রিগা মার্ক-২ (TRIGA Mark-II) গবেষণা রিঅ্যাক্টর চালু হয়। ১৯৮৭-৮৮ সালে জার্মান লামেয়ার ইন্টারন্যাশনাল (Lahmeyer International) ও সুইস মটর কলম্বাস ৩০০-৫০০ (Motor Columbus) মেগাওয়াট সুপারিশ করে। ১৯৯০-৯৬ সালে প্রাক-প্রস্তুতি শুরু হলেও সীমাবদ্ধতায় থেমে যায়। এরপর ১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতি পারমাণবিক শক্তিকে বিকল্প উৎস হিসেবে অনুমোদন করে। ১৯৯৭-২০০০ সময়ে উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকল্প ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ৬০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করা হয়। পরে ২০০৫ সালে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০০৭ সালে দুটি ৫০০ মেগাওয়াট ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সি এস করিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০০৮ সালে সরকার প্রকল্পে চীনের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে।
২০০৯ সালে একটি কার্যকরী অগ্রগতি সাধিত হয়, যখন পারমাণবিক শক্তিকে জাতীয় টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে একীভূত করা হয়। এর ফলস্বরূপ নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশেষ করে রাশিয়ার সাথে অংশীদারিত্ব শুরু হয় ২০১১ সালের আইজিসিএ (IGCA) চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে। ২০০৯-২০১২ সাল পর্যন্ত প্রাক-প্রকল্প কার্যক্রমের মধ্যে ছিল সাইট সিলেকশন, পরিবেশগত সমীক্ষা (EIA) এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) সুপারিশ বাস্তবায়ন। ফলস্বরূপ, এই প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক পর্যায় এবং মূল নির্মাণ পর্যায়– এই দুই পর্যায়ের নির্মাণ পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে (২০১৩-২০১৭) সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রযুক্তি নির্বাচন, নকশা উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং নিরাপত্তা প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য ডিপ মিক্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূমি স্থিতিশীলকরণের (Soil Stabilization) কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC) ২,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ (VVER-1200) চুল্লির জন্য জেএসসি এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট (JSC Atomstroyexport)-এর সাথে একটি সাধারণ চুক্তি (General Contract) স্বাক্ষর করে। প্রকল্পের মোট খরচ প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে রাশিয়া ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল নির্মাণ কাজ শুরুর নিমিত্তে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA) থেকে সাইটিং লাইসেন্স প্রদান করা হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১ এর ডিজাইন এন্ড কনস্ট্রাকশন লাইসেন্স পাওয়ার পর ৩০ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে প্রকল্পের মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয়। বর্তমানে, রূপপুর এনপিপি বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যা সারা বিশ্বের সামনে বাংলাদেশকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উভয় ইউনিটের নির্মাণ কাজের সিংহভাগ সম্পন্ন হয়েছে এবং কমিশনিং এর কাজ পুরোদমে চলমান রয়েছে। উল্লেখ্য ইউনিট ১ এর কমিশনিং কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি চালু হলে বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির লাইফটাইম ৬০ বছর এবং কিছু কারিগরি মেরামত সম্পন্ন করে লাইফটাইম আরও ২০-৩০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান জানান, সব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে গত ১৬ এপ্রিল কেন্দ্রটিকে ফুয়েল লোডিংয়ের চূড়ান্ত লাইসেন্স প্রদান করা হয়।
বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পথে আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে যাচ্ছে। সব প্রস্তুতি শেষে আজ বিকেলে প্রথম ইউনিটে শুরু হতে যাচ্ছে পরমাণু জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম। এর ফলে দেশ প্রথমবারের মতো পরমাণু শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করল। তবে আজ জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হলেও বিদ্যুৎ পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও ৩ মাস
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও রুশ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে আজ (২৮ এপ্রিল) জ্বালানি লোডিংয়ের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া শুরুর তিন মাসের মধ্যে- অর্থাৎ জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক