মরদেহ নিতে অস্বীকৃতি, স্ত্রী-সন্তানের অবহেলায় পাঁচ দিন মর্গে
স্ত্রী ও দুই সন্তান- সবই ছিল তার। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তে পাশে ছিল কেবলই নিঃসঙ্গতা আর অবহেলা। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী খোকন মিয়া শেষ পর্যন্ত বিদায় নিলেন এমন এক পৃথিবী থেকে, যেখানে আপনজনরা পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরও তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ দিন হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকার পর অবশেষে একদল অচেনা মানুষের কাঁধে চড়েই শেষ বিদায় নিলেন তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে টানা পাঁচদিন পড়ে ছিল খোকন মিয়ার নিথর দেহ। পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ছোট ছেলে রানা প্রথমে মরদেহ নিতে আসবেন বলে আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত আর আসেননি। বরং পরে জানিয়ে দেন- মরদেহের জন্য অপেক্ষা না করে যেন দাফন সম্পন্ন করা হয়। পরিচয় থাকার পরও স্ত্রী-সন্তানদের এমন অনাগ্রহে উপস্থিত সবার মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ মার্চ সংক্রমণজনিত রোগ ‘সেলুলাইটিস’ নিয়ে পুলিশ খোকন মিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করে। দীর্ঘ ৩৮ দিনের চিকিৎসা শেষে গত ৩০ এপ্রিল রাত ১০টার দিকে হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎসক ও নার্সদের পাশাপাশি মানবিক সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ তার চিকিৎসা ও সার্বিক সহযোগিতায় পাশে ছিল। মৃত্যুর আগে অস্পষ্ট কণ্ঠে খোকন মিয়া নিজের নাম ও ঠিকানার কথা জানিয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরেই এনআইডি ও প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু তার স্ত্রী নিলুফা আক্তার ও দুই ছেলে রাজু ও রানা চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে বা মরদেহ গ্রহণ করতে আগে থেকেই অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
পুলিশ কুমিল্লার দেবিদ্বার থানায় যোগাযোগ করে জানতে পারে, খোকন মিয়ার শ্বশুরবাড়ি দেবিদ্বারের করুইন গ্রামে এবং পৈতৃক বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। পরিবার দাবি করে, গত ১০-১২ বছর ধরে খোকন মিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। এই অজুহাতেই তারা মরদেহ গ্রহণে অনড় থাকে। শেষ পর্যন্ত কোনো সন্তানই বাবার কাঁধ হতে ছুটে আসেনি।
অবশেষে অনাথের মতোই খোকন মিয়াকে দাফন করতে এগিয়ে আসে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’। গতকাল মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেলে সংগঠনটির উদ্যোগে তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
এ বিষয়ে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিন বলেন, আমরা চাই, কেউ যেন অন্তত শেষ বিদায়ে অবহেলিত না থাকে। কেউ না থাকলে আমরা আছি, এই বিশ্বাস থেকেই কাজ করি।
উল্লেখ্য, খোকন মিয়ার দাফনের মধ্য দিয়ে সংগঠনটি এ পর্যন্ত ২৫৩টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন সম্পন্ন করল।

শিহাব উদ্দিন বিপু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া