কাছের জেলায় অন্তর্ভুক্তি চায় পদ্মার চরের অবহেলিত মানুষ
কয়েক যুগ কেটে গেছে তবুও পদ্মার চরাঞ্চলের অবহেলিত মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন হয়নি। পাবনা ও কুষ্টিয়ার ১৬ গ্রামের ৪০ হাজারের বেশি মানুষ প্রমত্তা পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে নিজ জেলায় যাতায়াত করে। এসব অঞ্চলে নেই চিকিৎসা ব্যবস্থা। নেই পুলিশ ক্যাম্প, পোস্ট অফিস, ব্যাংক, জরুরি সরকারি সেবা। রাস্তাঘাট, অবকাঠামোসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা।
কাগজ কলমে তারা এক জেলার বাসিন্দা হলেও হাটবাজার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবন যাপন সবই অন্য জেলার সঙ্গে। জটিল সীমানা ভাগাভাগিতে কুষ্টিয়ার ৯ গ্রাম পদ্মার এপারে পাবনা সদরের সঙ্গে আর পাবনার সাতটি গ্রাম পদ্মার ওপারে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কাছে রয়ে গেছে। পাবনার সদর উপজেলার দোগাছি ও ভাড়ারা ইউনিয়নের চরভবানীপুর, খাসচর, কণ্ঠবজরা, ধাবড়াকোল, বলরামপুর গ্রাম পদ্মার ওপারে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর কাছে অবস্থিত। এসব গ্রামের বাসিন্দারা হাটবাজার চিকিৎসাসহ দৈনন্দিন জীবন-যাপন কুমারখালী ও কুষ্টিয়া শহরের ওপর নির্ভরশীল। শুধু জরুরি জমির কাগজপত্র, থানা-কাচারিতে পাবনা শহরে আসতে হয় তাদের। নদী বিচ্ছিন্ন এসব মানুষদের দুর্বিষহ কষ্ট নিয়ে নৌকায় ভেসে, পদ্মার উত্তপ্ত বালুচরে মাইলের পর মাইল হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়।
আজ শুক্রবার (৮ মে) পাবনা সদরের কোমরপুর পদ্মা নদীর ওপার থেকে নৌকায় করে ঘাটে আসতে দেখা যায় পাবনার জেলার বাসিন্দাদের। পাবনার ধাবড়াকোল এলাকা থেকে মো সুজন নৌকায় পদ্মা পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন কোমরপুর আসেন স্থানীয় ইটের ভাটায় কাজ করতে। তিনি জানান, প্রতিদিন যাতায়াতে নৌকার ভাড়া দিতে ১০০ টাকা। শুষ্ক বালুচরে অটোবাইকের ভাড়া না থাকায় হেঁটে গন্তব্যে চলেন তিনি। নদীর খেয়াঘাটে অটোবাইকে এসে নামতে দেখা যায় চর ঘোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের একটি ফুটবল দলকে। আকাশে কালো মেঘ, বৈরী আবহাওয়াতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে এসব শিশুরা যাবে নিজ জেলা কুষ্টিয়ায় একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নিতে। এসব ক্ষুদে ফুটবলার জানায়, সময়মতো নদী পাড় হতে না পারলে টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া যাবে না।
কোমরপুর পদ্মা নদী ঘাটের খেয়া নৌকার মাঝি বলেন, প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ প্রয়োজনীয় কাজে নিজ জেলায় যাতায়াত করে নৌকায়। শুষ্ক মৌসুমে নদীর চরে অনেকটা পথ তাদের অটোবাইকে যেতে হয়।
চরভবানীপুর থেকে পদ্মা পাড়ি দিয়ে পাবনায় জন্ম নিবন্ধনের কাজে এসেছেন মো. আবু শরিফ হাসনাত। তিনি বলেন, বর্ষায় সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে নদী পথ দিয়ে আসতে হয়। পাবনা শহরে একটি এনজিওতে চাকরি করেন মো. আশরাফ উদ্দিন। প্রতিদিন পদ্মা পাড়ি দিয়ে নিজ জেলায় আসা সম্ভব না হওয়াতে পাবনা শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। তিনি বলেন, কাছের জেলার সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিই সব সমস্যার সমাধান হতে পারে।
পাবনা সদর উপজেলার গা ঘেঁষে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চরসাদিপুর ইউনিয়ন। চরসাদিপুর ইউনিয়ন থেকে তাদের নিজ জেলা কুষ্টিয়া শহরে ২৯ কিলোমিটার পদ্মার উত্তপ্ত ধুধু বালুচরে হেঁটে ও নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয়। এই ইউনিয়নে ৯ গ্রামে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বসবাস করে। কুষ্টিয়া জেলার এই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের হাট-বাজার, শিক্ষা চিকিৎসা সবই তিন কিলোমিটার দূরত্বের পাবনা শহরের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তাদের পাবনা শহরে। চরসাদিপুর ইউনিয়নের বেশিরভাগ রাস্তার ইটখোয়া বিলীন হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে রাস্তায় হাঁটুসম ধুলায় চলাচল করে গাড়ি। গ্রীষ্মে ধুলার কারণে তাদের জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় চরম অবহেলিত চর সাদিপুরের মানুষ। প্রশাসনের নজরদারির অভাবে সেখানে মাদক, বাল্যবিবাহ, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কাজ বাড়ছে।
স্থানীয়রা জানায়, চরসাদিপুরের বাসিন্দাদের চলাচল, হাট-বাজার, শিক্ষা চিকিৎসা সবই পাবনায়। ইউনিয়নটি পাবনার সঙ্গে সংযুক্ত হলে অবহেলিত জনগোষ্ঠী আলোর মুখ দেখবে। এই ইউনিয়নে পদ্মার দুর্গমচর পাড়ি দিয়ে পুলিশ ও সরকারি অফিসাররা আসে না। যুগ যুগ ধরে সরকারি সেবা বঞ্চিত তারা।
চরসাদিপুরের বাসিন্দা মো. আলতাফ বলেন, শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ইউনিয়নটি পাবনা জেলার সঙ্গে সংযুক্তির।
পাবনা মহিলা কলেজের ছাত্রী সামান্তা বলে, এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র নদীর ওপারে। নদীপথে বাড়ি থেকে সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে না শিক্ষার্থীরা। সেজন্য অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে অনেক শিক্ষার্থী পাবনা জেলার স্কুলে চলে যায়।
মমতা পারভীন বলেন, তিনি কুষ্টিয়ার জেলার বাসিন্দা হলেও তিনি ৬০ বছরের জীবনে কুষ্টিয়ায় যাননি। নিজ চোখে কুষ্টিয়া শহরও দেখেননি। পাবনা শহরেই তাদের হাট-বাজার। প্রমত্তা পদ্মা নদী বিচ্ছিন্ন বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অবস্থানের ভিত্তিতে কাছের জেলার সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিই হতে পারে এই সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় বলে মনে করে, পাবনায় পদ্মা নদী বিচ্ছিন্ন অবহেলিত মানুষ।
পাবনা সদর উপজেলা পরিষদের প্রশাসক তামারা তাসবিহা বলেন, নতুন যোগদানের কারণে বিষয়টি নিয়ে অবগত নই।
পাবনা জেলা প্রশাসনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে নদী বিচ্ছিন্ন এসব চরাঞ্চলের সীমানা জটিলতা নিরসন করে কাছের জেলার সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি করা নিয়ে কাজ চলছে।

এ বি এম ফজলুর রহমান, পাবনা