আকাশের বীর আসিম জাওয়াদ, মায়ের হৃদয়ে চিরঅপেক্ষা
সময় বয়ে যায় আপন গতিতে, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দুই বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু মানিকগঞ্জের এক মায়ের কাছে সময় যেন থমকে আছে ২০২৪ সালের সেই ভয়াল ৯ মে’র সকালেই। দরজার ওপাশে আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না জেনেও তিনি যেন আজও পথ চেয়ে বসে থাকেন- এই বুঝি বিমানবাহিনীর পোশাক পরে স্মিত হেসে ঘরে ঢুকবেন তার একমাত্র ছেলে স্কোয়াড্রন লিডার আসিম জাওয়াদ।
২০২৪ সালের ৯ মে চট্টগ্রামের বিমানবাহিনী ঘাঁটি জহুরুল হক থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ মিশনে উড্ডয়ন করেছিল ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমানটি। আকাশে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেটিতে আগুন ধরে যায়। অত্যন্ত সংকটময় সেই মুহূর্তেও নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে আসিম জাওয়াদ ও তার সহকর্মী সোহান হাসান খান শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন জ্বলন্ত বিমানটিকে জনবহুল এলাকা থেকে দূরে সরিয়ে নিতে, যাতে মাটিতে থাকা সাধারণ মানুষের কোনো ক্ষতি না হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় বিএনএস পতেঙ্গা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন এই সাহসী আকাশযোদ্ধা।
মানিকগঞ্জ শহরের বাসায় আজও পরম যত্নে তুলে রাখা আছে আসিম জাওয়াদের ব্যবহৃত ক্যাপ, মেডেল ও ইউনিফর্ম। প্রতিটি স্মৃতিচিহ্ন যেন বিষাদমাখা হাহাকার হয়ে ফিরে আসে মায়ের কাছে। দেয়ালে টাঙানো হাসিমাখা ছবিটি যেন নীরবে জানান দেয়- দেশের আকাশ রক্ষা করতে গিয়ে এক সাহসী প্রাণ হারিয়ে গেছে অজানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ‘আকাশের নীরব বীর’ বলে অভিহিত করা হলেও, পরিবারের কাছে তিনি এক না ফুরানো শূন্যতার নাম।
সম্প্রতি আসিম জাওয়াদের খালা ও শিক্ষিকা পারভিন আক্তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন পোস্টে তার শোকাতুর বোন তথা আসিমের মায়ের যন্ত্রণা তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, বিমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্যারাস্যুটের কার্যকারিতা নিয়ে পরিবারের মনে জমে থাকা নানা প্রশ্নের অবতারণা করেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগেই আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন আসিম। সেই অর্জনের গর্ব আজ পরিবারটির কাছে শুধুই অশ্রুভেজা স্মৃতি।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আসিম জাওয়াদের মায়ের অপেক্ষা ফুরায়নি। প্রতিদিনের মতো আজও তিনি ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে খুঁজে বেড়ান সেই প্রিয় মুখটি। দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া এই বীরের স্মৃতি মানিকগঞ্জ তথা সারা বাংলাদেশের মানুষের মনে চিরভাস্বর হয়ে থাকলেও, মা কেবল তার সেই হারানো বুক খালি করা ধনকেই ফিরে পেতে চান। যার বিদায়ে মানিকগঞ্জের আকাশও যেন আজও বেদনায় নীল হয়ে আছে।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ