নারায়ণগঞ্জে দুই মাসে পুলিশ-র্যাবের ওপর ৫ হামলা, জনমনে আতঙ্ক
শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে হঠাৎ করেই আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে অপরাধপ্রবণতা। মাদক কারবারি, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। গত দুই মাসে পুলিশ ও র্যাবের ওপর অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
গত ৫ মে ফতুল্লার মাসদাইর ও বোয়ালিয়া খাল এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয় র্যাব-১১ এর একটি গোয়েন্দা দল। মাদক কারবারিদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। এর আগে ৩০ এপ্রিল বন্দরে ছিনতাইয়ের তদন্তে গিয়ে হামলার শিকার হন দুই পুলিশ সদস্য। হামলাকারীরা এক কনস্টেবলের আঙুল কেটে দিয়ে তার সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। পরে অভিযান চালিয়ে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়।
এর আগে ১৫ মার্চ গলাচিপা এলাকায় পুলিশ ও সোর্সের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ৯ মার্চ নিতাইগঞ্জ এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের এএসআই লুৎফর রহমানের ওপর হামলা করে সরকারি পিস্তল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া ৬ মে শহরের কাশিপুর এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আটক পাঁচ আসামিকে ছিনিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা।
ফতুল্লার দেওভোগ ও রূপগঞ্জের চনপাড়া এলাকাতেও পরোয়ানাভুক্ত আসামি ধরতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি ঘটনায় আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে জানা গেছে, মাসদাইর ও চনপাড়ার মতো অপরাধপ্রবণ এলাকায় সন্ত্রাসীরা এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তারা ড্রোন ও উন্নত সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। কোনো এলাকায় পুলিশ প্রবেশ করলেই মোবাইল অ্যাপ ও ড্রোনের মাধ্যমে তারা সতর্ক হয়ে যাচ্ছে ও হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চাষাঢ়া, কালীরবাজার ও ফতুল্লা এলাকার বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে এক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাও নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে।
তোলারাম কলেজের এক শিক্ষার্থীর মা তাহমীনা আক্তার বলেন, আগে মেয়ে সকালে কোচিংয়ে যেত। এখন ভয় লাগে। ছিনতাইকারীর হাতে শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর কোচিং বন্ধ করে দিয়েছি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিন রতন বলেন, আগে সন্ত্রাসীরা পুলিশ দেখলে পালাত, এখন তারা পুলিশের ওপরই হামলা করছে। তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
নারায়ণগঞ্জের সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় না আসা এবং শাস্তি না পাওয়ায় অপরাধ বাড়ছে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব ও যোগসাজশে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। অপরাধীরা যে পর্যায়েরই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা মানে রাষ্ট্রের ওপর হামলা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কামরুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ (সদর-সোনারগাঁ-বন্দর)