নারায়ণগঞ্জে তিন দিনব্যাপী ‘পাগলা গাছের মেলা’ শুরু
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের হামছাদী গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী তিন দিনব্যাপী ‘পাগলা গাছের মেলা’। গতকাল শনিবার (১৬ মে) স্থানীয় সনাতন ধর্মের অনুসারীরা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে এ মেলার আয়োজন করেন। ৫০০ বছরের পুরোনো এই মেলাকে কেন্দ্র করে শত শত ভক্ত ও দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
সনাতন ধর্মাবলম্বী ও পাগলা গাছের পূজার প্রধান পুরোহিত তপন চক্রবর্তী মেলার ইতিহাস সম্পর্কে জানান, উপজেলার হামছাদী গ্রামে প্রায় ৫০০ বছর ধরে দুটি গাছের খুঁটিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীর লোকজন আনুষ্ঠানিকভাবে পূজা-অর্চনা করে আসছেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, প্রায় ৫০০ বছর আগে স্থানীয় দুই ভাই সুরেন্দ্র সেন ও ফনি সেন ঘর তৈরির জন্য বার্মা (মিয়ানমার) থেকে ২০টি গাছের খুঁটি কিনে বাড়িতে আনেন। এক রাতে তারা দুই ভাই স্বপ্নে দেখেন, ফনি সেনের বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে একটি পুকুর পাড়ে তাদের ২০টি খুঁটির মধ্যে দুটি খুঁটি পড়ে আছে এবং ওই খুঁটি দুটিতে মহাদেব পাগল আকারে রূপ ধারণ করেছেন। সেদিনটি ছিল বাংলা সনের ১ জ্যৈষ্ঠ। এরপর থেকেই স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই দুটি গাছের খুঁটির পূজা অর্চনা শুরু করেন।
পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ চন্দ্র শীল জানান, অলৌকিক ও মহাদেব রূপে থাকা এই খুঁটি দুটি সারা বছর পাশের একটি পুকুরের পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে। প্রতি বছর বাংলা বছরের জ্যৈষ্ঠ মাসের ১ তারিখে পুকুরে থাকা খুঁটি দুটি অলৌকিকভাবে ভেসে ওঠে। তখনই সনাতন ধর্মাবলম্বী পাগল ভক্তরা পুকুর থেকে খুঁটি দুটি উঠিয়ে ডাঙায় এনে দুধ, কলা, ঘি ও বিভিন্ন ফল-ফলাদি দিয়ে ভোগ দেন। পাশাপাশি পাঠা বলি দিয়ে পাগলের নামে উৎসর্গ করা হয়। ভক্তদের ভক্তি ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতি বছর এখানে এই মেলার আয়োজন করা হয়।
দিলীপ চন্দ্র শীল আরও জানান, এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটিতে স্থানীয়ভাবে একটি মন্দির নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য তারা স্থানীয় সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
মেলায় আসা সুজা রানি দাস নামের এক পুণ্যার্থী বলেন, আমার ছেলের জন্য এখানে মান্নত করা ছিল। তাই মেলায় এসে ছেলের মাথা মুণ্ডন করিয়েছি এবং মহাদেবের নামে পূজা দিয়েছি। পরবর্তীতে গাছের খুঁটি পুকুরে ডুবানোর সাথে সাথে আমরাও স্নান করেছি। বিশ্বাস করি, এতে মনের বাসনা পূরণ হয়।
গোপাল দাস নামের আরেক দর্শনার্থী জানান, তিনি প্রতি বছরই এই মেলায় আসেন। এবারও মহাদেবের নামে পূজা দিতে পেরে তার খুব ভালো লেগেছে এবং মেলার পরিবেশও বেশ সুন্দর ছিল।
আয়োজকরা জানান, মেলা উপলক্ষে মেলার বটমূলে তিন দিনব্যাপী দেশের বিভিন্ন এলাকার বাউল শিল্পী ও পাগলদের পরিবেশনায় পালাগান, বাউল গান, জারি-সারি গান, গীতাপাঠ, কীর্তন ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া মেলা প্রাঙ্গণে বসেছে মিঠাই-মণ্ডাসহ বাহারি পণ্যের দোকানের পসরা। বাঁশের বাঁশি, কাঠের চেয়ার, হাতপাখা, চৌকি, মোড়া, চুড়ি ও প্লাস্টিকের খেলনাসহ বিভিন্ন সামগ্রী সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকেও অসংখ্য পুণ্যার্থী ও ভক্ত মেলায় অংশ নিয়েছেন।
সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম সারওয়ার বলেন, পাগলার মেলায় পূজা-অর্চনা করতে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

কামরুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ (সদর-সোনারগাঁ-বন্দর)