সরকারি জমি দখল করে কারখানা, শীতলক্ষ্যায় যাচ্ছে রাসায়নিক বর্জ্য
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভার নোয়াপাড়া জামদানি পল্লী এলাকার পাশে সরকারি জমি ও খেলার মাঠ দখল করে ‘ট্রু ফেব্রিক্স লিমিটেড’ (সাবেক ইউনিফিল টেক্সটাইল) নামক একটি নিটিং ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানা স্থাপন করার অভিযোগ উঠেছে। কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্য সরাসরি শীতলক্ষ্যা নদী ও লোকালয়ে ফেলায় একদিকে যেমন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয়রা, অন্যদিকে মাঠটি হারিয়ে যাওয়ায় মাদকের দিকে ঝুঁকছে এলাকার যুবসমাজ।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জমিটি উদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মাঠটি ফিরে পাওয়ার আশায় এলাকাবাসী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
সরেজমিনে জানা গেছে, বিসিক নোয়াপাড়া জামদানি পল্লির পূর্বপাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ১২ বিঘা ৭ শতাংশ জমি রয়েছে। ১৯৯৬ সালে নোয়াপাড়া গ্রামের হাজী আলাউদ্দিন জমিটি লিজ নিয়ে শতাধিক যুবকের কর্মসংস্থানের জন্য সমবায় ভিত্তিতে মাছের খামার গড়ে তোলেন। ২০১১ সালের পর লিজ নবায়নে জটিলতা তৈরি হলে তিনি আদালতে মামলা করেন। পরবর্তীতে ওই জমিতে খেলার মাঠ ও জামদানি পল্লির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা করার শর্তে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রস্তাবে ২০১২ সালে তিনি মামলা তুলে নেন।
এমপির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জলাশয় ভরাট করে সেখানে খেলার মাঠ গড়ে তোলা হলে এলাকার শিশু-কিশোররা খেলাধুলা শুরু করে। তবে ২০২৩ সালে হাজী আলাউদ্নের মৃত্যুর পর স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রভাব খাটিয়ে সেখানে ‘ইউনিফিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড’ নামে ডাইং কারখানা গড়ে তোলা হয়। পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে ‘ট্রু ফেব্রিক্স লিমিটেড ও ২২৪ নিটিং ডাইং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং’ নামক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আহাম্মদ আলী ও শরীফ আহমেদ লিটন মিয়া অভিযোগ করেন, কোনো প্রকার ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) ছাড়াই কারখানার বিষাক্ত, রঙিন ও গরম কেমিক্যালযুক্ত পানি সরাসরি শীতলক্ষ্যা নদী, খোলা জলাশয়, পতিত জমি এবং বিসিক জামদানি পল্লি এলাকায় ফেলা হচ্ছে। এতে করে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং স্থানীয়রা নানা চর্ম ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
রূপসী কাজীপাড়া গ্রামের জিন্নাত আলী কাজী বলেন, সরকারি জমি হলেও আওয়ামী লীগ আমলের তাদের নেতাদের সহযোগিতায় এটি দখল হয়। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে মাঠটি ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
তারাবো পৌরসভার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে জামদানি পল্লি স্থাপনের সময় শিল্পীদের সুবিধার্থে পাশে সবুজায়ন, স্কুল, খেলার মাঠ এবং আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য জলাশয় রাখা হয়েছিল। এখন সেই ১২ বিঘা ৭ শতাংশ জমি বেদখল হয়ে গেছে। এই অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে সাবেক মেয়র নিজে জেলা প্রশাসক বরাবরে এবং হাজী আলাউদ্দিনের ছেলে আলী আকবর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করেছেন।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে ট্রু ফেব্রিক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জামান দাবি করেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী এবং পরিবেশবান্ধব। এখানে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির কোনো সুযোগ নেই। এই জমি আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে লিজ নিয়েছি, এটি কোনো খেলার মাঠ নয়। সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী এই সমস্যার সমাধান করে দিয়েছিলেন। এখন একটি পক্ষ আমাদের হয়রানি করার চেষ্টা করছে।
যোগাযোগ করা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নরসিংদী অঞ্চলের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) হুমায়ুন কবির বলেন, জায়গাটি নিয়ে মামলা এবং দুদকের নোটিশের জটিলতা রয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের কোনো বিধান নেই। আমরা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও তারাবো পৌরসভার প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারি জমি ও খেলার মাঠ দখলের বিষয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। সরকারি জমি দখল হয়ে থাকলে এবং নিয়মবহির্ভূত কোনো কাজ হলে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধ দখলদার যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

শাকিল আহম্মেদ, নারায়ণগঞ্জ (রূপগঞ্জ)