ফাঁকা ঢাকায় বাসের আকাল, রিকশা পেতেও ছুটছে ঘাম
ঈদের ছুটিতে চিরচেনা যানজটের ঢাকা এখন পুরোপুরি শান্ত ও কোলাহলমুক্ত। তবে রাজধানীর এই স্বস্তিদায়ক চিত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে যাতায়াতের চরম ভোগান্তি। ঈদের এই সময়ে রাস্তায় গণপরিবহনের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, আর সেই সুযোগ লুফে নিয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাচালকরা। অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবাগুলোতেও গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। ফলে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া মানুষগুলো নিরুপায় হয়ে রিকশা ও সিএনজির দ্বারস্থ হলেও, চালকরা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া হাঁকাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাস মিলছে না, তার ওপর রিকশা-সিএনজিচালিত অটোচালকরাও বাড়তি ভাড়া চাচ্ছেন। সব মিলিয়ে ছুটির দিনে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া ঢাকার মানুষ যাতায়াত করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
মতিঝিল থেকে খিলগাঁও যেতে যেখানে রিকশা ভাড়া হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ৭০-৮০ টাকা, সেখানে আজ দাবি করা হচ্ছে ১৩০-১৫০ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে আদাবর থেকে কারওয়ান বাজার বা পান্থপথের মতো দূরত্বে যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ১০০ থেকে ১২০ টাকা ভাড়া হওয়ার কথা, সেখানে আজ ১৮০-২০০ টাকার নিচে কোনো চালক যেতে রাজি হচ্ছেন না। অপরদিকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দু-একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া গেলেও ভাড়া চাচ্ছে দ্বিগুণ।
আদাবর এলাকায় থাকেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মালিহা। ঈদের ছুটিতে তাকে পেশাগত কারণে প্রতিদিন অফিসে ছুটতে হচ্ছে। আজ সকালে অফিসে আসার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, গতকালও ভোগান্তি হয়েছে, আজ পরিস্থিতির আরও অবনতি। আজ সাতসকাল অফিসে বের হয়ে রিকশার জন্য ৪০ মিনিট রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। রিকশা পাওয়া গেলেও চালক এখানে যাবে না, ওখানে যাবে না শুনতে হচ্ছে। কোনো মতে একটি রিকশা পাওয়া গেলেও ভাড়া চাচ্ছে বেশি। যদি একটু দরা কষাকষি করতে গিয়ে রিকশা ছেড়ে দেই, তবে আরেকটি পেতে অনেক সময় নষ্ট হবে ভেবেই বেশি ভাড়া ওঠে পড়তে হচ্ছে। মালিহার মতো এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে চিকিৎসক, নিরাপত্তাকর্মী এবং জরুরি সেবায় যুক্ত কর্মীদের।
একই অভিজ্ঞতার শিকার মাহমুদুল হাসান নামের এক কর্মজীবী। জরুরি প্রয়োজনে গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে তিনি পড়েছেন চরম সংকটে। মিরপুর ২ -এর মোড়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বাসের। মাহমুদুল বলেন, রাস্তায় গাড়ি একদমই নেই বললেই চলে। যেটা আসছে সেটাও অনেক দেরি করে। আমরা যারা বাসযাত্রী, আমাদের সময় আর ভোগান্তির যেন কোনো দাম নেই। গণপরিবহণ সংকটে পড়ে ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ও বাসের মধ্যে বসে অন্য যাত্রীদের অপেক্ষা এখন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন মিরপুর থেকে আসা নিরাপত্তাকর্মী রহমত পিয়াল। তিনি বলেন, রাস্তায় জ্যাম নেই, কিন্তু বাস দাঁড়িয়ে আছে ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে। চালকের কথা হলো গাড়ি তো খালি নিয়ে যেতে পারবো না, যাত্রী পূর্ণ না হলে বাস ছাড়বো না।
ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক ডাক্তার শারমীন আজ সকালে ডিউটিতে যাওয়ার পথে শ্যামলীতে চরম বিড়ম্বনায় পড়েন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও সিএনজিচালিত অটোরিকশা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, শহর এখন অনেকটাই ফাঁকা, কিন্তু রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়াই যাচ্ছে না। শ্যামলীতে সিএনজির খুব সংকট। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দু-একটি পাওয়া গেলেও ভাড়া চাচ্ছে একদম দ্বিগুণ। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো যেখানে জরুরি, সেখানে সিএনজি খুঁজতেই অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে। একই অবস্থা গত তিনদিন ধরে।
আজ সকাল থেকেই রাজধানীর মিরপুর, বনানী, শাহবাগ ও মতিঝিল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তায় বাসের সংখ্যা হাতেগোনা। ছুটির সুযোগে ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুটের বেশিরভাগ বাস দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহণে নিয়োজিত হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। একেকটি বাসের জন্য যাত্রীদের মোড়ে মোড়ে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। রাস্তা ফাঁকা থাকলেও বাসের গতি বাড়েনি।

মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান