শিশু রামিসা হত্যা : আদালতে যা বললেন ১৬ সাক্ষী
বহুল আলোচিত রাজধানীর শিশু রামিসা হত্যা মামলায় প্রথম দিনে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর পৌনে ১টা পর্যন্ত আদালতে ১০ জনের এবং মধ্যাহ্ন বিরতির পর বাকি ৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। এরপর ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকী আগামীকাল বুধবার (৩ জুন) আসামি সোহেল রানা ও স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের আত্মপক্ষ সমর্থনের দিন নির্ধারণ করেন।
এর আগে আজ সকালে কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সোহেল ও স্বপ্নাকে আদালতে আনা হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় বিচার কাজ শুরু হয়।
প্রথমে রামিসার বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যে তিনি বলেন, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টায় আমি অফিসে যাওয়ার উদ্দেশে বাসা থেকে বের হই। অফিস বনানীর কাকলীতে। সকাল ১০টা থেকে সোয়া ১০টার মধ্যে আমার স্ত্রী পারভীন আক্তারের ফোন পাই। সে আমাকে বাসায় আসতে বলে। বাসায় এসে দেখি মেইন গেটের সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে আছে। এরপর আমি দৌড় দিয়ে ফ্ল্যাটের সামনে যাই। সেখানেও অনেক লোক জড়ো হয়ে আছে।
আরও পড়ুন : সোহেলের জবানবন্দিতে রামিসা হত্যার নৃশংস বর্ণনা
আরও পড়ুন : রামিসা হত্যা মামলা : আদালতে যা বললেন বাবা, মা ও বোন
রামিসার বাবা আরও বলেন, আমার স্ত্রী পাশের ফ্ল্যাটের দরজার ধাক্কাচ্ছে। সবাই মিলে ডাকাডাকি করছে। তখন আমি নিচে গিয়ে একটা হাতুড়ি আনি। ‘ডোর লক’ হাতুড়ি দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করি। তাতে লকটা ভেঙে খুলে যায়। সবাই মিলে পুরো দরজাটাই ভেঙে ফেলি। পরে সবাই ভেতরে যাই। ঢুকেই দেখি ফ্ল্যাটের কমন রুমের ফ্লোরে সামান্য অল্প একটু রক্ত পড়ে রয়েছে। তখন স্বপ্না চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। কিছু বলছিল না। এক পর্যায়ে তাদের বেডরুমের দরজা সবাই মিলে ভেঙ্গে ফেলি। টয়লেটে বালতিতে মেয়ের বিচ্ছিন্ন মাথা দেখে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর কী হয়, আর কিছু বলতে পারি না।
এরপরে রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী কলিমউল্লাহ জেরায় জিজ্ঞেস করেন, এই ঘটনা কি আপনি নিজ চোখে দেখেছেন?
তখন রামিসার বাবা বলেন, আমি যতটুকু দেখেছি ততটুকুই বলেছি। এরপরে তিনি আদালতে মিথ্যা সাক্ষী দিয়েছেন বলে আইনজীবী দাবি করেন। জবাবে রামিসার বাবা বলেন, এটা (আইনজীবীর কথা) মিথ্যা।
পরবর্তীতে রামিসার মা পারভীন আক্তার সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালতে আসেন। তিনি এই মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী। তিনি বলেন, আনুমানিক সকাল ১০টা হবে। আমি তখন রান্না করছিলাম। দুই মেয়ের পার্শ্ববর্তী চাচার বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। গিয়েছে কি না আমি বুঝতে পারিনি। এরপর রান্নাঘর থেকে চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। তখন মনে করেছি পাশের ফ্ল্যাটের কোনো বাচ্চা হয়তো চিৎকার দিচ্ছে। এদিকে, আমি অপেক্ষা করছি রামিসা এখনও আসছে না কেন। কখন আসবে। কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে একাই বাসায় ফিরে। আমি ওকে রামিসার কথা জিজ্ঞেস করি। তখন রামিসা বলে, সে তো আমার সঙ্গে যায়নি।
পারভীন বলেন, আশপাশে খোঁজ করেও রামিসাকে পাচ্ছিলাম না। সবাইকে রামিসার কথা জিজ্ঞেস করি। কিন্তু সবাই বলে, রামিসাকে দেখিনি। বাসার নিচে একটা অফিসের কাজ চলছিল। সেখানে ঢুকে দেখি রামিসা আছে কি না। এরপর দোতলায় খুঁজি। সেখানেও নেই। আমি পাশের ফ্ল্যাটের দরজার কড়া নাড়ি। কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। হঠাৎ চোখ পড়ে দরজার সামনে মেয়ের একটা স্যান্ডেল। তখন আমার ভাবনায় আসে মেয়েকে কি এখানে আটকে রেখেছে। আমার শব্দ শুনে পাঁচতলা থেকে আসমা নামের এক নারী নেমে আসেন। ধীরে ধীরে আশপাশের লোকজনও চলে আসে। তাদেরকে জানাই রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার স্বামীকেও ফোন দেই। অনেকে চেয়ার নিয়ে ওপর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না।
আরও পড়ুন : শুনানি শেষে সোহেল বললেন, ‘রামিসা হত্যায় ডলারও জড়িত’
আরও পড়ুন : নিজের স্ত্রীকে নির্দোষ দাবি করলেন সোহেল রানা
রামিসার মা পারভীন আরও বলেন, আমরা সবাই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকি। তখন রাজু নামের একটি ছেলে ভিডিও করছিল। স্বপ্না হাঁটাহাঁটি করছিল। বেডরুমের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলে বাথরুমে অনেক রক্ত দেখতেই পাই। এরপর রামিসার বিচ্ছিন্ন মাথাও দেখি। পুলিশ এসে রামিসার জামা ও মরদেহ উদ্ধার করে। স্বপ্নাকে আমি অনেকবার বলেছি, বোন দরজাটা খুইলা দে, খুইলা দে। কিন্তু ও খোলে নাই। আমি ওকে কোনো প্রশ্ন করতে পারিনি। উপস্থিত লোকজনই ওকে প্রশ্ন করেছে। পরে আমি তাদের কাছ থেকে শুনতে পাই, সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালাইছে।
এরপরে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, সোহেল ও স্বপ্নাকে কী চিনেন? তারা কী আদালতে আছে? সে সময় কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সোহেল রানার দিকে আঙ্গুল তুলে রামিসার মা বলেন, হত্যা ও করছে। সেই ধর্ষণ করছে। আমি বিচার চাই।
তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন রামিসার বোন রাইসা আক্তার। রাইসা শিশু সাক্ষী হওয়ায় ক্যামেরা ট্রায়ালে সাক্ষ্যগ্রহণ চলে। ক্যামেরা ট্রায়াল চলার কারণে এবং আইনি বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে রাইসা আক্তারের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন রামিসার ফুপু মাহমুদা খাতুন। তিনি বলেন, রামিসা আমার ভাতিজি। আমাকে স্বামী মিজানুর রহমান ফোন দেয়। আমি ফোন পেয়ে যাই। রামিসাদের বাসার নিচে গিয়ে দেখি অনেক পুলিশ। এরপর আমি তৃতীয় তলায় যাই। পরে জানতে পারি রামিসা হত্যাকাণ্ডের শিকার। সোহেল রামিসাকে ধর্ষণ করে হত্যা করে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না সোহেলকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
সাক্ষ্যে তিনি বলেন, রুমে গিয়ে দেখি রামিসার মাথা কাটা। রংয়ের বালতির মধ্যে রামিসার কাটা মাথা রাখা হয়েছে এবং রামিসার শরীরের অন্য অংশ খাটের তলায় রাখা।
এরপর রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী -- প্রশ্ন করেন— আপনি কী ঘটনা দেখেছেন? তখন মাহমুদা খাতুন বলেন, না, আমি ফোন পেয়ে এসেছি। এরপরে আইনজীবী বলেন, আপনি ভাইয়ের কথায় আবেগপ্রবণ হয়ে আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলেন। মাহমুদা খাতুন বলেন, না, এটা (আইনজীবীর কথা) মিথ্যা।
আরও পড়ুন : রামিসার লাশ দেখে সোহেলের স্ত্রীকে চড়থাপ্পড় মারি : রাজু
পঞ্চম সাক্ষী চাচা মিজানুর রহমান লিটন সাক্ষ্যে বলেন, আমার বাসা মিরপুর ১১ নম্বরে। আমি ঘটনার দিনে নিউমার্কেটে যাচ্ছিলাম। মেট্রোস্টেশন থেকে আমি মেট্রোতে উঠি। শাহবাগ নামার পরে আমার কাছে ফোন আসে রামিসার বিষয়ে। আমি দ্রুত যাই। গিয়ে দেখি বাসার নিচে পুলিশসহ অনেক মানুষ। আমাকে প্রথমে ঢুকতে দেয় না। আমি আমার পরিচয় দিয়ে তিন তলায় উঠি। সেখানে পুলিশ আমাকে যেতে বাধা দেয়। আমি আমার পরিচয় দেওয়ার পরে আমাকে যেতে দেয়। আমি মানুষ ঠেলে বাসায় গিয়ে দেখি, রংয়ের বালতির মধ্যে রামিসার কাটা মাথা রাখা আছে এবং রামিশার শরীরের অন্য অংশ খাটের তলায় রাখা। সোহেল বাসা থেকে পালিয়েছে এবং তার বউ (স্বপ্না) তাকে সহায়তা করেছে। স্বপ্নাকে পুলিশ আটকে রেখেছে।
ষষ্ঠ সাক্ষী চতুর্থ তলার বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, আমি পেশায় গাড়িচালক (ড্রাইভার)। ঘটনার দিন আমি ঘুমাচ্ছিলাম। আমার বাসা তৃতীয় তলায়। ঘুমের মধ্যে আমি চতুর্থ তলার দরজায় কেউ জোরে জোরে বাড়ি দিচ্ছে এমন শব্দ পাই। এরপর আমি চিল্লাচিল্লি শুনি। আমি এরপরে ঘুম থেকে উঠে চতুর্থ তলায় যাই। গিয়ে দেখি রামিসার মা সোহেলের স্ত্রীকে দরজা খুলতে বলে। দরজা না খোলার কারণে রামিসার বাবা আসার পরে দরজা ভেঙে আমরা ভিতরে যাই। ভিতরে গিয়ে দেখি রুমের বাথরুমের মধ্যে রক্ত। একটা রংয়ের বালতির মধ্যে রামিসার কাটা মাথা রাখা এবং রামিসার শরীরের অন্য অংশ খাটের তলায় রাখা আছে।
সপ্তম সাক্ষী প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু বলেন, ঘটনার দিন রামিসা নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের সঙ্গে খোঁজাখুঁজি করে তারা প্রধান আসামি সোহেল রানার ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার জুতো দেখতে পান। সোহেল রানার ফ্ল্যাটের দরজায় বারবার কড়া নাড়তে থাকেন এবং ডাকাডাকি করেন। কিন্তু ভেতর থেকে প্রধান আসামি সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্না কোনো সাড়া দেননি এবং দরজা খোলেননি। পরে কোনো উপায় না পেয়ে একপর্যায়ে তারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে খণ্ডিত অবস্থায় রামিসার মরদেহ দেখতে পান। এই নৃশংস দৃশ্য দেখে তারা সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। পরে ক্ষেপে গিয়ে স্বপ্নাকে চড়-থাপ্পড় মারি এবং ঘটনার ভিডিও করি।
রাজু বলেন, সোহেলের স্ত্রীকে এলাকাবাসী মারতে চাইছিল। কিন্তু আমি বাঁধা দিয়েছি। আমার বাধার কারণে তাকে মারতে পারেনি। তিনি বলেন, ভিতরে গিয়ে দেখি বাথরুমে রক্ত। পানি দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইছিল। কিন্তু রক্তের জমাট দেখা গেছে। এছাড়া রামিসার মাথা রংয়ের বালতির মধ্যে কাটা অবস্থায় এবং শরীর খাটের নিচে।
অষ্টম সাক্ষী দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা শেখ আবু সামাদ বলেন, আমি বায়িং হাউজে জব করি। সকালে নাস্তার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি, একজন খালি গায়ে সেই ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে নেমে দৌড়ে চলে যাচ্ছে। আমি অনেকবার চোর চোর করে চিৎকার করি। কিন্তু কোনো রেসপন্স পাইনি। পরে আবার নাস্তা শুরু করি। কিছুক্ষণ পর মানুষের চিৎকার শুনে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে রামিসার মরদেহ দেখতে পাই। পরে মানুষের কাছে আমি ঘটনার বর্ণনা জানতে পারি।
নবম সাক্ষী ফুপা মনিরুজ্জামান শাহীন সাক্ষ্যে বলে, আমি বাসায় ছিলাম। আমার বাসা মিরপুর ১১নং-এ। সকাল ১১টায় আমাকে স্ত্রী রোজিনা ফোন দেয়। ফোন দিয়ে বলে রামিসা নেই। এরপরে আমি দ্রুত সেই বাসায় যাই। বাসায় গিয়ে দেখি, রামিসার কাটা মাথা বালতির মধ্যে এবং কাটা শরীর খাটের নিচে রাখা।
দশম সাক্ষী হিসেবে কনস্টেবল রোমা আক্তার বলেন, রামিসার বিষয়ে থানায় তথ্য পাওয়ার পরে স্যারদের সঙ্গে আসি। এসে দেখি রামিসার মাথা দ্বিখণ্ডিত এবং শরীর আলাদা করা। এরপরে সুরতাহালের মধ্যে স্বাক্ষর করি।
১১নং সাক্ষী কনস্টেবল শরীফ মিয়াও রোমা আক্তারের মতো একই কথা বলেন।
১২নং সাক্ষী এসআই ইকবাল হোসেন সাক্ষ্যে বলেন, থানায় ওয়ারলেসের মাধ্যমে ঘটনার তথ্য পাই। আমি কনস্টেবল রোমা আক্তার এবং শরীফ মিয়াসহ ওই বাসায় যাই। বাসায় যাওয়ার পরে দেখি ঘাতক সোহেল রামিসার মাথা দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছে এবং শরীর আলাদা করে রেখেছে। শিশু রামিসার যৌনাঙ্গে ক্ষতবিক্ষত ছিল। রামিসার দুই হাতও কেটে ফেলেছিল। একটু চামড়া লেগেছিল। না হলে হাতও খুলে পড়ে যেত। এরপর রামিশার জুতা, ওড়না, ছুরি, গ্রিলসহ অনেক কিছু জব্দ করি। এরপর আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাক্ষী এসআই ইকবাল হোসেন।
১৩নং সাক্ষী চিকিৎসক নাসাদ জাবিন বলেন, লাশ নিয়ে আসলে আমি ময়নাতদন্ত করি। ভিকটিম ফ্রিজের মধ্যে ছিল বিধায় কখন মারা গেছে জানি না। ভিকটিমের মাথা আলাদা করে বীভৎসভাবে মারা হয়েছে বলে রিপোর্ট প্রদান করি।
১৪নং সাক্ষী ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ বলেন, আসামি সোহেলকে আমি ৩ ঘণ্টা ১৬৪ করার সময় দেই। আসামি রাজি হলে তার জবানবন্দি গ্রহণ করি। আসামি বুঝে-শুনে আমার কাছে যা বলেছে তা লেখা হয়।
১৫নং সাক্ষী এসআই রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমি কুইক রেসপন্স টিমের সদস্য। ঘটনার পরে ওসি স্যারের নির্দেশে আসামিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করি। পরে আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়।
১৬তম সাক্ষী মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. অহিদুজ্জামান বলেন, মামলার সকল কাগজ পর্যালোচনা এবং আসামির ১৬৪ এবং অন্যান্য সাক্ষীদের ১৬১ ধারায় সাক্ষ্য গ্রহণ করি। নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সতত্য পাওয়া যায়। এরপরে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করি।
এর আগে গত ২৪ মে মামলার আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। এরপরে সিএমএম আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলির আদেশ দেন।
পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে সোহেলের স্বীকারোক্তির বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে আসামি সোহেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এবং তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে হত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে ১৭ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তবে একজন সাক্ষ্য দিতে আসেননি।
আসামি সোহেল রানা স্বীকারোক্তিতে বলেন, সাবলেটের অন্য সদস্যরা প্রতিদিন কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। ঘটনার দিন ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পাশের বাসার শিশু রামিসাকে দেখতে পেয়ে তিনি তাকে নিজের কক্ষে ডেকে নেন। পরে শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে যান। সেখানে রামিসা চিৎকার শুরু করলে তিনি তার মুখ চেপে ধরেন এবং মুখে কাপড় গুঁজে দেন। এরপর তাকে ধর্ষণ করেন। একপর্যায়ে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তিনি তাকে মৃত মনে করেন। পরে অপরাধের আলামত নষ্ট করার উদ্দেশে একটি ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে মরদেহ বিকৃত করার চেষ্টা করেন।
জবানবন্দিতে সোহেল আরও বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এলাকার লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা রামিসাকে খুঁজতে শুরু করে। একপর্যায়ে শিশুটির মা তার কক্ষের সামনে রামিসার জুতো দেখতে পান এবং তাকে ডাকাডাকি শুরু করেন। কোনো সাড়া না পেয়ে আশপাশের লোকজন তার কক্ষের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে পালিয়ে যেতে বলেন। এরপর তিনি একটি রেঞ্চ ব্যবহার করে জানালার গ্রিল ভেঙে ফেলেন।
সোহেল জবানবন্দিতে আরও বলেন, বাইরে লোকজন যখন দরজায় ক্রমাগত ধাক্কা দিচ্ছিল, তখন তার স্ত্রী দরজা আটকে রেখে তাকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। সোহেল পালিয়ে যাওয়ার পর স্বপ্না দরজা খুলে দেন।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, শিশু রামিসা আক্তার পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতরে নেয়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। একপর্যায়ে আসামির ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। ডাকাডাকির পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে তার মাথা দেখতে পান। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এ ঘটনার পরদিন ২০ মে ভুক্তভোগীর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। আসামি সোহেল রানা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। মাদক সেবন করে বিকৃত যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া এই আসামি আদালতকে জানায়, ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে তার পূর্ব শত্রুতা ছিল না।

শুভ্র সিনহা রায়