পুশইনের প্রতিবাদে রাজধানী ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সমাবেশ করবে ১১ দল
ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ-ইন ও সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে আগামী শুক্রবার (১২ জুন) দেশের সীমান্তবর্তী সব জেলা এবং সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ সব পয়েন্টে প্রতিবাদ সমাবেশ করবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এছাড়া আগামী সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর শাহবাগের হাদী চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে দলগুলো।
আজ বুধবার (১০ জুন) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচির ঘোষণা দেন ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
সংবাদ সম্মেলনে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দেশের সীমান্ত আজ অরক্ষিত। সীমান্তে হত্যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের চলমান পরিস্থিতি। তবে বর্তমান সরকারের আমলে সীমান্ত হত্যার যে চিত্র দেখা যায়, সেটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র প্রতিবেশীমূলক আচরণ না করে বাংলাদেশের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করে যাচ্ছে। তারা বলে, ভারতের ডিকশনারিতে পুশ-ইন বলে কিছু নেই। তবে তারা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে জোরপূর্বক অনেক লোক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিজিবির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে না তুললে ভারত এতদিনে তাদের দেশের অনেক নাগরিককে এদেশে পুশ-ইন করতো। ইতোমধ্যে কিছু কিছু জায়গায় পুশ-ইন হয়েছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গত তিন মাসে ৫০ এর অধিক সীমান্তবর্তী এলাকায় পুশ-ইনের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে পুশ-ইন করার চেষ্টা হয়েছে। তবে বাস্তব সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি বলে দাবি করেন তিনি।
সরকারের ১০০ দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে ১৯ জন নিরীহ বাংলাদেশি নিহত হয়েছে উল্লেখ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, একই সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছে ২৪ জন। বিএসএফ এবং মিয়ানমারের আরাকান আর্মি ৮৩ জনকে আটক করে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সীমান্ত হত্যা নিয়ে সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মন্ত্রীরা দায়িত্বশীল জায়গা থেকে মন্তব্য করার সময় মনে রাখতে হবে তারা বাংলাদেশের মন্ত্রী। এক্ষেত্রে তার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বয়ানটা হয়ে গেছে ভারতীয় মন্ত্রীদের মতো। বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী এ ধরনের বক্তব্য দিতে পারেন সেটি বিশ্বাস করা কঠিন।
এ প্রসঙ্গে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কেউ অপরাধ করলে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারবে, ভয় দেখানোর জন্য ফাঁকা আওয়াজ করতে পারবে। তবে মরণঘাতী অস্ত্র, সরাসরি আঘাত, গুলি করে হত্যা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি চরম আঘাত। এমন কাজকে সমর্থন জোগাতে পারে, এমন বক্তব্য দেওয়া জাতীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেউ যাতে দেশের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ভিনদেশের স্বার্থ চরিতার্থ করার অপচেষ্টা না চালায়। এমনটি করা হলে বাংলাদেশের ক্ষতি করতে বিএসএফ আরও বেশি উৎসাহিত হবে।
বিএনপি সরকারের ১০০ দিনে দেশের আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে উল্লেখ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, সরকারের ১০০ দিনে সারা দেশে মোট ফৌজদারী মামলা হয়েছে ৫১ হাজার ৪৮৬টি। ক্রমশ এটি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিন মাসে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৯১৫টি। গুম, চুরি, ডাকাতি এমনকি আগের কায়দায় পুলিশ হেফাজতে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, একই সময়ে ৮৫২টি দলীয় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপির হাতে খুন হয়েছে ৪১ জন, তার মধ্যে নিজের দলের কর্মী ১৮ জন, সাধারণ মানুষ ১৯ জন আর জামায়াতের ৪ জন। বিএনপির হাতে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪৩ জন নারী। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির ঘটনা ঘটেছে ১৪১টি। বিএনপি নেতা–কর্মীদের মাধ্যমে হামলার ঘটনা ঘটেছে ২৪২টি। লুটপাট ও দখলের ঘটনা ঘটেছে ৬১টি, চুরি–ডাকাতি ৫৮টি, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে ৬৮টি।
সংবাদ সম্মেলনে সীমান্তে নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়ে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, পুশ ইন ঠেকাতে বিজিবিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের জনগণকে মানবপ্রাচীর গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো সন্ত্রাসী, চোরাকারবারি বা অপরাধী সেই প্রাচীর ভেদ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ভারতকে ১২টি চিঠি দেওয়ার পরও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। এজন্য সরকারকে সঠিক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে। সরকার এরপর চিঠি পাঠালে যেন শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা উল্লেখ করে।
৩২টি জেলার সীমান্তে একযোগে প্রতিবাদ সমাবেশ, মানবপ্রাচীর করা হবে উল্লেখ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, ১৯৭১ সালে যেভাবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, একইভাবে এখন সীমান্তে যদি কোনো রাষ্ট্র বা বাহিনী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে লঙ্ঘন করতে চায়, তাহলে দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যৈষ্ঠ নায়েবে আমির আব্দুল মাজেদ আতহারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মহাসচিব ইকবাল হোসেন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির মহাসচিব নিজামুল হক প্রমুখ।

নিজস্ব প্রতিবেদক