সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি বাড়ায় ভাঙন আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণের কারণে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পানি বাড়ার কারণে যমুনা নদী বেষ্টিত জেলার চৌহালী ও কাজীপুরে চরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন। পানি বাড়ায় ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে নদীপাড়ের মানুষ।
ভাঙনের জন্য দায়ী করা হচ্ছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে। ভাঙনে বাড়ি-ঘর, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নদী ভাঙনের পাশাপাশি প্লাবিত হচ্ছে চরাঞ্চল। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ হার্ড পয়েন্ট এলাকায় ১৫ সেন্টিমিটার ও কাজীপুর উপজেলার মেঘাই ঘাট পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
ভাঙন কবলিত মানুষের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমেও থেমে নেই যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন। প্রভাবশালী একটি মহল ইজারাকৃত জায়গার বাইরে এসে সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধের (১নং ক্রস বাঁধ) সামনে থেকে ড্রেজার দিয়ে প্রতিদিনই বালু উত্তোলন করছেন। এতে হুমকির মুখে পড়েছে বাঁধ সহ ফসলী জমি, ঘরবাড়ি, গাছপালা। আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের। বিষয়টি স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসকে অভিহত করেও কাজ হয়নি।
ভাঙনে বাড়ি ঘর হারানো মানুষের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে বালু উত্তোলন করেছে। এখন বর্ষা মৌসুম, তারপরও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। বালু উত্তোলনের কারণে গত ১৭ এপ্রিল কাজীপুরে যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ এলাকায় অস্বাভাবিক ভাঙন দেখা দেয়। উপজেলার পলাশপুর ঘাট এলাকায় দুটি স্থানে নদীর তীর ধসে পড়ে যমুনায় বিলীন হয়ে যায়। তার পরও বন্ধ হয়নি বালু উত্তোলন। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ। তাদের দাবি অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা এবং সদর উপজেলার ছোনগাছা ইউনিয়নের পাঁচ ঠাকুরি এলাকায় একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা গেলে এই এলাকা ভাঙন থেকে রক্ষা পাবেন তারা।
সদর উপজেলার ভাটপিয়ারি গ্রামের আব্দুস ছালাম বলেন, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু দিন আগে উজানে বালু উঠাইছে। বালু উঠানোর কারণে গভীর হইছে। নদীর মধ্যে সুরঙ্গ তৈরী করে কিনারে আইসা ধাক্কা দিতাছে। যে কারণে বস্তা গুলো দাইবা জাইতাছে। অবৈধভাবে গায়ের জোরে বালু তুলতাইছে। নদীর মাঝখানে চর পড়ছিল। কিন্তু বালু উঠাইতে উঠাইতে ভাঙন শুরু হইয়া পুরা চর নদীর মধ্যে চইলা গেছে। এই চরে আমি কুশাল, গম, কালাই সহ বিভিন্ন ধরনের আবাদ করতাম। এখন আমার কিছুই নাই। এখানে একটা স্থায়ী বাঁধ দরকার। তাইলে বাড়ি-ঘর রক্ষা পাইবো।
ভাটপিয়ারি গ্রামের হাবিবুর রহমান বলেন, বালু তোলার কারণে ক্ষতি হইতাছে। আমি তিন ভাঙা দিছি। বাড়ি-ঘর সবই আছিল। চরের জমির ফসল বেইচা ছেলে মেয়ে বিয়া দিছি। এখন কিছুই নাই। অনেক চেষ্টা কইরা গুচ্ছ গ্রামে ঘর পাছি। একটা বাঁধ দিলে নিশ্চিন্তে থাকতাম। বালু তোলা বন্ধ করতে হইবো। বালু সর্বনাশের মূল। ভাঙনে কত মানুষ যে নিঃস্ব হইছে কেউ কইবার পারব না। বর্ষার শুরুতেই যে অবস্থা হইছে। বর্ষার সময় না জানি কি হইবো। ভয় করে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, জুন থেকে সেপ্টম্বর এই চার মাস মাস বর্ষা মৌসুম। এসময় যমুনা নদীতে পানি বাড়তে থাকে। দেখা দেয় বন্যা। তবে এই মুহূর্তে বন্যার আশঙ্কা নেই। গত ৮ জুন থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত একটানা পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ১৪ ও ১৫ জুন কিছুটা পানি কমলেও ১৬ জুন পানি স্থিতিবস্থায় ছিল। সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ হার্ড পয়েন্ট এলাকায় ১৭ জুন ১০ সেন্টিমিটার ও আজ ১৮ জুন ১৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। একই সময় কাজীপুর উপজেলার মেঘাই ঘাট পয়েন্টে ১৭ জুন ১৫ সেন্টিমিটার ও আজ ১৮ জুন ১৩ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। পানি আরও বাড়বে। ভাঙন কবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ভর্তি বালির বস্তা ফেলে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কেউ যদি বাঁধ এলাকায় বালু উত্তোলন করে থাকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শরীফুল ইসলাম ইন্না, সিরাজগঞ্জ