এক ফেসবুক পোস্টেই বদলে গেল অসহায় জান্নাতির জীবন
কিছু গল্প কেবল কষ্টের নয়, মানবিকতার জয়ে রাঙানো এক অনন্য রূপকথা। মাত্র দুই মাস বয়সে বাবা এবং এর কিছুদিন পরই মাকে হারানো এতিম জান্নাতি খাতুনের জীবন ছিল শুধুই বঞ্চনার। বড় হয়ে বিয়ের বয়স হলেও অর্থাভাবে আটকে ছিল তার নতুন জীবনের স্বপ্ন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের একটি পোস্ট বদলে দিয়েছে সবকিছু। দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় গত শুক্রবার (১০ জুলাই) এক জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে সম্পন্ন হয়েছে এই এতিম তরুণীর বিয়ে।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার প্রত্যন্ত কলাগাছি গ্রামের বাসিন্দা মোছা. জান্নাতি খাতুন। জন্মের পর থেকেই মা-বাবাহীন জান্নাতি বড় হয়েছেন তার ভ্যানচালক নানা আব্দুল হক ও নানী সুন্দরী বেগমের চরম অভাবের সংসারে। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সেই সংসারে ছোটবেলা থেকেই না-পাওয়ার কষ্ট ছিল জান্নাতির নিত্যসঙ্গী। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বিয়ের সম্বন্ধ এলেও বিয়ের খরচ জোগানোর সামর্থ্য ছিল না বৃদ্ধ নানার। নাতনির ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন অসহায় নানা-নানি গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই তাদের পাশে দাঁড়ান স্থানীয় সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস। তিনি নিজের ফেসবুক আইডিতে জান্নাতির জীবনের করুণ গল্প ও অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরে সবার কাছে সহায়তার আবেদন জানান।
মুহূর্তের মধ্যেই সেই পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অসহায় মেয়েটির স্বপ্ন পূরণে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন অসংখ্য হৃদয়বান মানুষ। তাদের পাঠানো প্রায় এক লাখ টাকার আর্থিক সহায়তায় দূর হয়ে যায় সব বাধা। অবশেষে রায়গঞ্জ উপজেলার পাঙ্গাসি গ্রামের যুবক ফিরোজ শেখের সঙ্গে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয় জান্নাতির বিয়ে। নতুন জীবনের শুরুতে দাঁড়িয়ে সব কষ্ট ভুলে জান্নাতি এখন সুখের সংসার গড়ার প্রত্যয়ে সবার দোয়া চেয়েছেন। তার স্বামী ফিরোজ শেখও স্ত্রীকে আজীবন ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
নাতনির এই রাজকীয় বিয়ে দেখে আনন্দাশ্রু ধরে রাখতে পারেননি নানা আব্দুল হক ও নানি সুন্দরী বেগম। তারা বলেন, অভাবের কারণে নাতনির কোনো ইচ্ছাই কোনোদিন পূরণ করতে পারিনি। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল বিয়ের খরচ নিয়ে। কিন্তু অচেনা-অজানা মানুষের ভালোবাসা আমাদের সব কষ্টকে আজ আনন্দে পরিণত করেছে। যারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
বিয়ের কাজী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকায় বহু বিয়ে দেখার অভিজ্ঞতা থাকলেও এতিম জান্নাতির এই বিয়েটি ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম ও চোখ ধাঁধানো। সুদৃশ্য তোরণ (গেট), রঙিন প্যান্ডেল, অতিথিদের জন্য বাহারি খাবারের আয়োজন- কোনো কিছুরই কমতি ছিল না সেখানে। বর-কনেকে দেওয়া হয়েছে আকর্ষণীয় সব উপহার। অসহায় এক এতিম মেয়ের বিয়ে ঘিরে পুরো গ্রামে যেন এক উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক তারেক শাহরিয়ার বলেন, একটি ফেসবুক পোস্ট, কিছু মানুষের আন্তরিকতা আর সম্মিলিত সহযোগিতা কীভাবে একটি অসহায় মানুষের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বিয়ে আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, জান্নাতি খাতুনের বিয়ে অন্য দশটি সাধারণ বিয়ের মতোই জাঁকজমকপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কনেকে বিউটি পার্লার থেকে সাজানো থেকে শুরু করে খাবার ও ডেকোরেশন- সবকিছুই ছিল চোখে পড়ার মতো। এটি কেবল একটি সাধারণ বিয়ে বা পারিবারিক আয়োজন নয়; এটি মূলত মানুষের মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের এক অনন্য ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

রফিক মোল্লা, সিরাজগঞ্জ (বেলকুচি-চৌহালি)