দুই কিলোমিটার সড়কে শুধু কাদা আর কাদা
তিন গ্রামের মানুষের বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। দুই কিলোমিটারের একটি গ্রামীণ সড়কে শুধু কাদা আর কাদা। মাঠের ফসল ঘরে তুলতে কষ্টের শেষ নেই কৃষকদের। বর্ষাকালে সব ধরনের যান চলাচল একেবারেই বন্ধ থাকে এই সড়কে। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেই যেন রোগীর জীবন অর্ধেক শেষ হয়ে যায়। সড়কটির এমন বেহাল দশা থেকে রক্ষা পেতে ভুক্তভোগীরা সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ছুটেও কোনো প্রতিকার পাননি।
গ্রামীণ এই সড়কটি নড়াইল সদর উপজেলার মূলিয়া ইউনিয়নের দূর্বাজুড়ি গ্রাম থেকে সীতারামপুর অভিমুখী। রাস্তার দুই পাশের গ্রামের বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে এই গ্রামীণ সড়কটি পাকা করার দাবি বহু পুরোনো। কিন্তু বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি মিললেও রাস্তায় উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি।
দূর্বাজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের গ্রামে তিন থেকে চার বার এমপি এসেছেন, এসে রাস্তাও দেখে গেছেন। তারা আশ্বস্ত করে যান যে রাস্তা হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর হয় না। আমাদের এক মণ ধান হাটে নিতে হলে ৪০ থেকে ৫০ টাকা ভ্যান ভাড়া দিতে হয়, তাও কাদার কারণে ভ্যানচালকরা আসতে চায় না। বর্ষা মৌসুমে এই কাদার জন্য গ্রামে ছেলে-মেয়ের বিয়ে পর্যন্ত হতে চায় না। আমরা চাই আমাদের এই রাস্তা দ্রুত পাকা হোক।
শুধু দূর্বাজুড়ি ও সীতারামপুর নয়, হিজলডাঙ্গা ও ইচড়বাহাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষের প্রধান চলাচল এই রাস্তায়। বর্ষা এলেই কাদায় ডুবে যায় গ্রামীণ এ পথটি। মাঠ থেকে ফসল ঘরে তুলতে যেমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তেমনি জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নেওয়াও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন কাদা মাড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়।
কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমীর গোলদার বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে ওঠে। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হয়। রাতে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কোনো গাড়ি পাওয়া যায় না। রোগী নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। রাস্তাটি পাকাকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু এই একটি সড়কই নয়, নড়াইল জেলার তিনটি উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গ্রামীণ সড়কগুলোর অধিকাংশ এখনও কাঁচা রয়ে গেছে। যার কারণে বর্ষা মৌসুমে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় ওই সব গ্রামের বাসিন্দাদের।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এলজিইডির অধীনে মোট ৩ হাজার ২২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ১ হাজার ৪৪৭টি সড়ক রয়েছে। তবে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, এই গ্রামীণ সড়কগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশই এখনও কাঁচা।
নড়াইল জেলার তিনটি উপজেলার মধ্যে কাঁচা সড়কের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি সদর উপজেলায়। উপজেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদর উপজেলায় মোট সড়কের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৮১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৭৩৮ কিলোমিটারই কাঁচা সড়ক, যা মোট সড়কের প্রায় ৬২ শতাংশ।
লোহাগড়া উপজেলায় মোট সড়কের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৯৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৭৮৯ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক, যা মোট সড়কের প্রায় ৬০ শতাংশ।
অন্যদিকে, কালিয়া উপজেলায় মোট সড়কের দৈর্ঘ্য ৭৪৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৪৩৩ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রয়েছে, যা মোট সড়কের প্রায় ৫৮ শতাংশ।
এলজিইডি আরও জানায়, নতুন সড়ক তালিকাভুক্ত (গেজেট) করার জন্য ইতোমধ্যে ৯৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ১ হাজার ১০০টি কাঁচা সড়কের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আরও ২৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ২১৪টি কাঁচা সড়ক নতুন করে তালিকাভুক্ত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
নড়াইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার ইকরামুল কবীর গ্রামীণ সড়কের এই বেহাল দশার কথা স্বীকার করে বলেন, জেলায় এখনও ৬০ শতাংশ রাস্তা কাঁচা আছে। তবে বর্তমান অর্থবছরে কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু রাস্তা সংস্কারের প্রক্রিয়া চলছে এবং কিছু রাস্তা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বিশেষ করে নড়াইল জেলা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ও বৃহত্তর যশোর জেলা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প দুটি প্রক্রিয়াধীন আছে। এই প্রকল্পগুলো পাস হয়ে গেলে আগামী অর্থবছরের মধ্যে আমরা কাঁচা রাস্তার পরিমাণ ৫০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে পারব বলে আশা করছি।

এম. মুনীর চৌধুরী, নড়াইল