এক সপ্তাহ পর চট্টগ্রামে সূর্যের দেখা, স্পষ্ট হচ্ছে বন্যার ক্ষতচিহ্ন
টানা এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পর অবশেষে চট্টগ্রামে সূর্যের দেখা মিলেছে। বৃষ্টি কমায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তৈরি হওয়া বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে শুরু করেছে। তবে পানি নামার সাথে সাথেই ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র। কোথাও ধসে গেছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, কোথাও ভেঙে পড়েছে ঘরবাড়ি। এছাড়া ফসলি জমি, মাছের ঘের ও মুরগির খামারের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠছে।
এরই মধ্যে নগরীর টাইগারপাস পলোগ্রাউন্ড বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলাকালীন একটি শতবর্ষী শিরিষ গাছ (কড়ই) উপড়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে শিক্ষার্থীরা মাঠে না থেকে ক্লাসরুমে থাকায় এক বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে। সিআরবি ও টাইগারপাস এলাকায় গত এক সপ্তাহে এমন ৮ থেকে ১০টি বড় গাছ উপড়ে পড়ার পাশাপাশি পাহাড় ধসের ঘটনাও ঘটেছে, যার ফলে ওইসব এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানি সংকট দেখা দিয়েছে।
এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলা। এর মধ্যে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এছাড়া আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’র আওতায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাসুদুল আলম বলেন, জেলার ১৭৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত বন্যায় ১১ জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন।
তবে বিভাগীয় কমিশনারের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে পাহাড় ধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত মোট ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১৩ জন, কক্সবাজারে ২৮ জন (১৩ জন রোহিঙ্গাসহ), রাঙামাটিতে ৩ জন এবং বান্দরবানে ৬ জন নিহত হয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, বন্যায় ৯ হাজার ৪৩ হেক্টর আউশ ধান, ৯৬০ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, ১৫টি উপজেলায় প্রায় ৪০ কোটি টাকার মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, বন্যায় প্রায় ২৮ কোটি টাকার প্রাণিসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে নগরীর বাকলিয়া, চান্দগাঁও, শুলকবহর, কাতালগঞ্জসহ নিচু এলাকা থেকে পানি সরতে শুরু করায় স্থবিরতা কাটিয়ে নগরীতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরছে। তবে অনন্যা-কুয়াইশ সড়কের আধা কিলোমিটার অংশ এখনো পানির নিচে থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। হালদা, শঙ্খ ও ডলু নদীর পানি কমলেও এখনও তা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত ২১টি রেগুলেটর বা স্লুইস গেট দ্রুত সচল করার লক্ষ্যে দুপুরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের উপস্থিতিতে এবং চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয়, প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ১ বছরের মধ্যে বাকি কাজ সম্পন্ন করে এই ২১টি রেগুলেটর এবং বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকা আরও ৩৯টি স্লুইস গেটের পরিচালনার ভার সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিকট হস্তান্তর করা হবে। স্লুইস গেটগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে সচল হলে নগরীর জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ. কে. এম শাহাবুদ্দিন, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, সাঈদ আল নোমানসহ সিডিএ, ওয়াসা ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আরিচ আহমেদ শাহ, চট্টগ্রাম