ফিরে দেখা : ১৬ জুলাই ২০২৪
সাঈদের দুহাত প্রসারিত বুক, এনটিভির ভিডিওতে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ
দুই হাত দুদিকে প্রসারিত। বুক টান করে একা দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণ। ঠিক সামনেই পুলিশের উদ্যত শটগান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছুটে এলো বুলেট। লুটিয়ে পড়েন ওই তরুণ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সামনে ঘটেছিল এই ঘটনা। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভির ক্যামেরায় সরাসরি সম্প্রচারিত এই দৃশ্য মুহূর্তেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। আবু সাঈদের সেই বুক পেতে দেওয়ার ভিডিও ক্লিপটিই মূলত ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলে। যা পরবর্তীতে রূপ নেয় ছাত্র-জনতার অপ্রতিরোধ্য ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়ে বদলে দেয় বাংলাদেশের ইতিহাস। আজ ইতিহাসের সেই বাঁক বদলানো রক্তাক্ত ১৬ জুলাইয়ের দ্বিতীয় বার্ষিকী।
রক্তাক্ত সেই বিকেল ও সাঈদের দ্রোহ
শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে গালি দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফুসে উঠে ছাত্রছাত্রীরা। সেই দাবানল ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এরইমধ্যে ১৫ জুলাই ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে পরদিন ১৬ জুলাই দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেদিন সারা দেশেই পুলিশ ও ছাত্রলীগ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মারমুখী অবস্থান নিয়েছিল।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে রংপুরের বেরোবি ক্যাম্পাসের ১ নম্বর গেটের সামনের সড়কে। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা জড়ো হলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ শুরু করে। একপর্যায়ে সবাই যখন ছত্রভঙ্গ, তখন রাস্তার মাঝে পুলিশের মুখোমুখি দুহাত প্রসারিত করে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে যান বেরোবির ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার হাতে ছিল কেবল একটি লাঠি। মাত্র ১৫ মিটার দূরে রাস্তার উল্টো পাশ থেকে পুলিশ শটগান দিয়ে সরাসরি তার বুক লক্ষ্য করে গুলি চালায়। একের পর এক গুলি লাগার পরও সাঈদ বুক টান করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আন্দোলনের এই সমন্বয়ক।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভির লাইভ ক্যামেরায় সাঈদের এই বীরত্ব ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য সরাসরি প্রচারিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিও ক্লিপ যেন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় জাগরণ তোলে।
এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে করা মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের বর্ণনাতেও উঠে এসেছে আবু সাঈদ হত্যার ভয়াবহ চিত্র।
২০২৫ সালের ৬ আগস্ট এনটিভির সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট এ কে এম মঈনুল হক ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুর ২টার আগে থেকে আমি ও আমার সহকর্মী ভিডিও জার্নালিস্ট আসাদুজ্জামান আরমান রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেটের সামনে পার্কের মোড় এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলাম। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুর প্রেসক্লাব এলাকা থেকে একটি মিছিল নিয়ে আমরা যেখানে অবস্থান করছিলাম সেখানে আসে। মিছিলটি যখন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেটের সামনে আসে সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও সরকারি দলের সমর্থকরা বাধা দেয়। পুলিশের আশপাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দেখতে পাই।’
সাক্ষী তার জবানবন্দিতে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেটের সামনে একটি সমাবেশ করার চেষ্টা করে, দু’একজন কথা বলার চেষ্টা করে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে যেতে চায়। এ সময় পুলিশ এবং তাদের সাথে যারা ছিল তারা বাধা দেয়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লাঠি চার্জ শুরু করে। আন্দোলনকারীরা লাঠিচার্জ থেকে নিজেদের বাঁচাতে আত্মরক্ষার্থে স্লোগান দিয়ে জমায়েত ধরে রাখার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ, রাবার বুলেট ও শটগানের গুলিবর্ষণ শুরু করে। তখন দুপুর ২টা পার হয়ে গেছে। এনটিভির দুপুর ২টার খবরও শুরু হয়ে গেছে। আমরা টিয়ারশেল, গুলিবর্ষণসহ সেখানকার ভীতিকর অবস্থার ভিডিও ফুটেজ সরাসরি এনটিভিতে প্রেরণ শুরু করি। সেই ভিডিও ফুটেজ দেখে এনটিভি কর্তৃপক্ষ আমাকে লাইভে সম্পৃক্ত হওয়ার নির্দেশ দেন। দুপুর আনুমানিক ২টা ১৩ মিনিটের দিকে আমার সহকর্মী ভিডিও জার্নালিস্ট আসাদুজ্জামান আরমানসহ আমি লাইভে যুক্ত হই।’
‘সেখানকার সামগ্রিক পরিস্থিতি এনটিভির মাধ্যমে সারা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরি। দুপুর আনুমানিক ২টা ১৭ মিনিটের দিকে ১নং গেটের সামনে রোড ডিভাইডারের একটি ছোট কাটা অংশ দিয়ে এগিয়ে এসে একজন যুবক কালো টিশার্ট ও কালো প্যান্ট পরা, রাস্তার ডিভাইডারের পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে।’
‘এ সময় তিনি (আবু সাঈদ) দুদিকে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে পড়েন। সেখান থেকে মাত্র কয়েক গজের দূরত্বে ১নং গেটের সামনে অবস্থানরত পুলিশ যারা আগে থেকে গুলি করছিলেন, তারা এই দুদিকে দুহাত প্রসারিত করা যুবককে উদ্দেশ্য করে গুলি করে। এই দৃশ্য তখন এনটিভিতে লাইভ সম্প্রচার চলছিল। পুলিশের গুলি এই যুবকের সামনের দিকে অর্থাৎ বুক ও পেটে বিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ওই যুবক কয়েক পা পিছিয়ে যান এবং বসে পড়েন। বসে পড়ার সাথে সাথে তিনি আবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি তার দেহের ভারসাম্য রাখতে না পেরে রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়েন।’
‘এ সময় তার অন্য সহযোগী কয়েকজন যুবক তাকে তুলে নিয়ে পার্কের মোড়ের দিকে নিয়ে যান। এনটিভির লাইভে তাকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য যতক্ষণ পর্যন্ত ক্যামেরায় আসছিল ততক্ষণ পর্যন্ত সম্প্রচার করা হয়। একই সাথে যখন ওই যুবককে গুলি করা হয় ঠিক সে সময় ক্যামেরা প্যান (ক্যামেরা ঘুরিয়ে) করে ১নং গেটের সামনে থেকে যে পুলিশরা গুলি করছিল তাদেরকেও এনটিভির লাইভে দেখানো হয়। আর ওই মুহূর্তের ঘটনাটি একমাত্র এনটিভি লাইভ সম্প্রচার করে।’
‘এরপর আমরা আমাদের অন্য সহকর্মীদের মাধ্যমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ ওই যুবককে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানতে পারি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারি, গুলিবিদ্ধ ওই যুবক রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং তার নাম আবু সাঈদ। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আমরা জানতে পারি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ আবু সাঈদ মৃত্যুবরণ করেছেন।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় জবানবিন্দ দিয়েছেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রীনা মুরমু। ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলনে তিনি সম্মুখসারিতে ছিলেন এবং আবু সাঈদ হত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী। রীনা মুরমু তার জবানবন্দিতে আন্দোলনে তাদের ওপর পুলিশের নির্যাতন এবং ১৬ জুলাই বেরোবির সামনে আবু সাঈদকে কীভাবে গুলি করা হয় তার বর্ণনা দিয়ে শেখ হাসিনার বিচারের আরজি জানান। শেখ হাসিনাসহ অপর আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের যে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে আবু সাঈদ হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
রীনা মুরমু তার জবানবন্দিতে বলেন, ১৬ জুলাই তারা আন্দোলনের জন্য দুটি জায়গা নির্ধারণ করেন। একটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় গেট। ওইদিন সকাল ১০টার দিকে জেলা স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। আমি প্রেসক্লাবের সামনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দিই। মিছিল নিয়ে চারতলা মোড়ে যাই। পথে পথে পুলিশ বাধা দেয়। আমাদের সঙ্গে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা যোগ দেয়। পার্ক মোড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের সামনে (বর্তমানে শহীদ আবু সাঈদ গেট) যাই। সেখানে আগে থেকেই পুলিশ, ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের লোকজন অবস্থান করছিল। আমরা কিছুক্ষণ অবস্থান করে মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেই। এসময় পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। অতর্কিতভাবে আমাদের
ওপর লাঠিচার্জ করা হয়। একপর্যায়ে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই এবং আমি কাছেই একটা খোলা চায়ের দোকানে গিয়ে আশ্রয় নেই।
রীনা মুরমু বলেন, সে সময় আবু সাঈদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা লাঠিপেটা করে। একপর্যায়ে আবু সাঈদ সড়কের ডিভাইডারের ওপাশে গিয়ে দাঁড়ান। তার দুই হাত প্রসারিত ছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট থেকে পুলিশ আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি করে। পরে ওই দুজন পুলিশের নাম আমি জানতে পারি।
তিনি বলেন, গুলিবিদ্ধ আবু সাঈদকে সহযোদ্ধা আয়ান সড়ক থেকে উঠিয়ে পার্ক মোড়ের দিকে নিয়ে যায়। আবু সাঈদকে গুলি করার পর ওই স্থানটি ফাঁকা হয়ে যায়। আমি চায়ের দোকানের যে জায়গাটায় ছিলাম সেখান থেকে দুই পুলিশকে গুলি করতে দেখেছি।
তেইশ বছর বয়সী আবু সাঈদ পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। সাঈদ তার পরিবারের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি শুরু থেকেই কোটা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।
গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ ও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ২০২৬ সালে ৯ এপ্রিল জুলাই ঘোষণা করা হয়। এতে দুজনের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন— পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন— সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ও সাবেক এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতিভূষণ রায়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদসহ এ মামলার মোট আসামি ৩০ জন। এরমধ্যে হাসিবুর রশীদসহ ২৪ আসামি পলাতক রয়েছেন
আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৩০ আসামির মধ্যে ছয়জন গ্রেপ্তার আছেন। তারা হলেন— বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ, পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ।
পলাতক আসামির মধ্যে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান, সাবেক সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক এমএলএসএস নুরুন্নবী মন্ডল রয়েছেন।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভের আগুন
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদ হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সারা দেশের মানুষের ক্ষোভের বাঁধ ভেঙে যায়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের আনাচে-কানাচে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ওইদিনই ঢাকার সায়েন্সল্যাব ও ঢাকা কলেজ এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাধারীদের সংঘর্ষে আরও দুটি তাজা প্রাণ ঝরে যায়। বলাকা সিনেমা হলের সামনে নিহত হন হকার মো. শাহজাহান (২৪) এবং সায়েন্সল্যাবে প্রাণ হারান শিক্ষার্থী সবুজ আলী (২৫)।
শিক্ষার্থীরা ঢাকার যাত্রাবাড়ী, সায়েন্সল্যাব, প্রগতি সরণি, বাড্ডা, উত্তরা ও মহাখালীসহ সব গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করেন। মহাখালীতে রেললাইন অবরোধ করায় ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ ৬ ঘণ্টা স্তব্ধ থাকে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। প্রগতি সরণিতে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তৎকালীন শাসকদলের ক্যাডারদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।
চট্টগ্রামের রক্তস্নাত দিন
সেদিন শুধু ঢাকা বা রংপুর নয়, বন্দরনগরী চট্টগ্রামও পরিণত হয়েছিল রণক্ষেত্রে। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় সেখানেও তিনজন নিহত হন। নিহতরা হলেন— চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম (২৪), ওমরগণি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ (২৪) এবং ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মো. ফারুক (৩২)। দেশব্যাপী এই সহিংসতাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়করা ‘রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট দমন-পীড়ন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ১৭ জুলাই গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলের ডাক দেন।
সরকারের দমননীতি
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন সরকার ওইদিন (১৬ জুলাই) রাতেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও গাজীপুরে বিজিবি মোতায়েন করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দেশের সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থগিত করা হয় ১৮ জুলাইয়ের এইচএসসি পরীক্ষাও। অন্যদিকে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ একে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার ঘোষণা দেয়। আইনি চাল হিসেবে ওইদিনই কোটা সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে চেম্বার কোর্টে লিভ টু আপিল করে সরকার।
এদিকে, বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে রাজপথে নামার ঘোষণা দেয়। এমনকি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ছাত্রলীগের তৎকালীন বেশ কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করেন।
শিক্ষার্থীদের ওপর এই নির্মম বলপ্রয়োগের ঘটনায় দেশ-বিদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সাউথ এশিয়া, টিআইবি, সুজনসহ পাঁচটি দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন এবং দেশের ১১৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক যৌথ বিবৃতিতে এই হামলার তীব্র নিন্দা ও জবাবদিহিতা দাবি করেন। নব্বইয়ের দশকের ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারাও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
নতুন বাংলাদেশের সূর্যোদয়
বুলেট দিয়ে সাঈদের শরীর ঝাঁঝরা করা গেলেও তার ভেতরের দ্রোহের আগুনকে নেভানো যায়নি। ১৬ জুলাইয়ের সেই রক্তপাতই পরবর্তীতে এক দফার আন্দোলনে রূপ নেয়। দমন-পীড়ন, কারফিউ আর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করেও জাগ্রত ছাত্র-জনতাকে থামানো যায়নি। ফলশ্রুতিতে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
আজ দুই বছর পর মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ‘১৬ জুলাই’ কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, এটি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাহসের প্রতীক, নতুন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর ও এক ঐতিহাসিক বাঁক পরিবর্তনের দিন।

নিজস্ব প্রতিবেদক