‘লাশটা পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়েন’, জুলাই যোদ্ধা তামিমের স্মৃতিচারণ
‘এই আন্দোলনে যদি আমার মৃত্যু হয়, আমার লাশটা আমার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়েন’—চারদিকে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ আর টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়ায় যখন দম আটকে আসছিল, তখন পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে ঠিক এই ভিডিও রেকর্ডটিই করেছিলেন তামিম ইকবাল।
তেজগাঁও কলেজের এ ছাত্র সেদিন যমুনা ফিউচার পার্কের পকেট গেটের উল্টো পাশের একটি গলিতে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে। কিন্তু বুকে ছিল একটাই সংকল্প—‘মরব, খুনি হাসিনার পতন করেই মরব।’
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর বসুন্ধরা-বাড্ডা এলাকায় ছাত্রদলের এই নেতার বীরত্ব ও বেঁচে ফেরার গল্প রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর। দুই বছর পর আজ শনিবার (১৮ জুলাই) এনটিভি অনলাইনের প্রতিবেদকের সঙ্গে সেই ভয়ার্ত ও গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন শিক্ষার্থী তামিম ইকবাল।
তামিম ইকবাল ২০২৪ এর জুলাইয়ের কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ১৮ জুলাই সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০ জুলাই থেকে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে তৎকালীন স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকার। ২১ জুলাই কারফিউর দ্বিতীয় দিন চলছিল। চারদিকে এক নীরব আতঙ্ক বিরাজ করছিল। আমরা ছাত্ররা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি টিম বসুন্ধরা গেটের দিকে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হতে থাকি। হঠাৎ করেই পুলিশ এসে অনবরত গুলি ও টিয়ারগ্যাস ছুড়তে থাকে। টিয়ারগ্যাসের তীব্রতায় টিকতে না পেরে কিছুটা পিছু হটতে হয়। শ্রাবণের কালো মেঘ যেন সূর্যকে কিছুটা আড়াল করে দিয়েছে।
‘গুলি এসে আমার পেটের ডান পাশে এবং ডান উরুতে লাগে’
পুলিশের গুলিবর্ষণের কথা স্মরণ করে তামিম ইকবাল আরও বলেন, চারদিকে যেন নীরব আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি একটু পরপর টইল দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের তেমন একটা উপস্থিতি নেই। হঠাৎ করেই পুলিশ, বিজিবি, র্যাব যৌথভাবে আমাদের লক্ষ্য করে অনবরত গুলি চালাতে থাকে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে উঠে। পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি এসে আমার পেটের ডান পাশে এবং ডান উরুতে লাগে। একপর্যায়ে টিয়ারগ্যাসের তীব্রতায় টিকতে না পেরে বিভিন্ন গলিতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেদিন আমিসহ তিনজন সহযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হই, একজন হকার এবং দুজন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের তাৎক্ষণিক গলির ভেতর দিয়ে হাসপাতালে পাঠাই। আমরা ইট পাটকেল নিয়ে পুলিশের সঙ্গে লড়াই করতে থাকি। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় বসুন্ধরা গেট এবং এর আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তারা আমাদের দুদিক থেকে আক্রমণ করছিল। দুই পাশ থেকে যখন গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড এবং টিয়ারগ্যাস ছুড়ছিল তখন মনে হচ্ছিল—‘আজই আমার জীবনের শেষদিন’। সেইসময় আমি ঠিক যমুনা ফিউচার পার্কের পকেট গেটের অপর পাশে। আমি পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে একটা ভিডিও রেকর্ড করি যে, ‘এই আন্দোলনে যদি আমার মৃত্যু হয়, আমার লাশটা আমার পরিবারের নিকট পৌঁছে দিয়েন।’ সেদিন মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম।
জুলাই যোদ্ধা তামিম ইকবাল বলেন, কিছুটা ভয় পেলেও, সংকল্প করেছিলাম—‘মরব, খুনি হাসিনার পতন করেই মরব’। আমাদের সহযোদ্ধারা, বিভিন্ন গলিতে আশ্রয় নেয়। কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়, টিয়ারগ্যাসে আক্রান্ত হয়ে সড়কে লুটিয়ে পড়ে। আমিও তখন টিয়ারগ্যাসে আক্রান্ত হয়ে একটি গলিতে আশ্রয় নিই। আমার অবস্থান ছিল যমুনা ফিউচার পার্কের পকেট গেটের অপর পাশে। নিরস্ত্র হলেও মনোবল হারাইনি। কিছুক্ষণ পরে এসে রাস্তায় জড়ো হওয়ামাত্রই পুলিশ আমাদের উদ্দেশ্যে আবারও গুলি করতে থাকে, যা আশপাশের দোকানের শাটার ও দেয়ালে লাগে! মহুর্মুহু গুলির তীব্রতা ও ভয়াবহতায় মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে রূপ নেয় পুরো এলাকা।
তামিম ইকবাল বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেসময় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘এল’ ব্লকের একটি বাসায় রাত্রিযাপন করতাম। নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল ১০টার মধ্যে কয়েকজন মিলে প্রগতি সরণির মহাসড়কটি অবরোধ করে অবস্থান নিতাম। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আমরা রাজপথ ছেড়ে দিতাম। ইন্টারনেট বন্ধ করে, কারফিউ জারি করে আন্দোলনের টুঁটি চেপে ধরেছিল তৎকালীন মাফিয়া সরকার। সেনাবাহিনীর টহল এবং পুলিশের গুলির মুখে অনেকেই ভয়ে বের হতেন না। আমরা আন্দোলন চালিয়ে গেছি, কারফিউর মধ্যেও ঝটিকা মিছিল করেছি। ওইদিনগুলো সহজ ছিল না। নির্মম গণহত্যা ও আন্দোলনের নগরীতে পরিণত হয়েছিল বসুন্ধরা গেট এলাকা। আমাদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই আমাদের মাঝে নেই। তারা পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন। তৎকালীন স্বৈরশাসক খুনি হাসিনাকে হটানোই ছিল আমার, আমাদের একমাত্র স্বপ্ন। ধারাবাহিক আন্দোলনের একপর্যায়ে ২৩ জুলাই কোটা সংশোধন করে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করলে অনেক আন্দোলনকারী নিজেকে গুটিয়ে নেন। তখন আন্দোলন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে ঝরে গেছে অনেক তাজা প্রাণ। মা হারিয়েছেন তার নাড়ি ছেঁড়া ধন, কিন্তু আমরা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রাজপথ ছেড়ে যাইনি। ২৬ জুলাই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার গ্রেপ্তার হলে আন্দোলনের পূর্ণ নেতৃত্ব চলে আসে ছাত্রদলের কাঁধে। তখন আমরা ছাত্র-জনতাকে একত্রিত করে আন্দোলনকে আরও চাঙা করে তুলি।
যুবলীগ-ছাত্রলীগের ধোঁকাবাজি
তামিম ইকবাল বলেন, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই বসুন্ধরা গেট অভিমুখে আমরা শক্ত অবস্থান নিই, অপরদিকে ছাত্রলীগ-যুবলীগের ছেলেরাও অবস্থান নেয় আমাদের বিপরীত মুখে। একপর্যায়ে তারা আমাদের উদ্দেশ্যে বলে, ‘আপনারা আপনাদের কাজ করুন। আমরা আমাদের কাজ করছি। আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না।’ এ জুলাই যোদ্ধা বলেন, আমরা ভেবেছিলাম তারা হয়তো সত্য বলছে। কিন্তু দুপুর আনুমানিক ২টা বাজে। হঠাৎ র্যাবের একটি দল হেলিকপ্টারে এসে উপর থেকে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। আমি তখন প্রগ্রতি স্মরণীর মাঝখানে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও টিয়ারগ্যাস দেখে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে উঠি। মনে হচ্ছিল, রাস্তাটা যেন বিশাল মাঠের মতো প্রশস্ত হয়ে গেছে। কোনোমতে দৌড়ে লন্ডন মার্কেটে ঢোকার চেষ্টা করি। মানুষের তীব্র চাপে সিঁড়িতে পড়ে আমার কোমরে মারাত্মকভাবে আঘাত পাই। একই দিনে ব্যাংক এশিয়া মোড়ে আবারও পুলিশের আক্রমণের শিকার হই। পুলিশ আমাকে বেধড়ক পেটায় এবং কোমরে একাধিক লাথি মারে, যার ফলে আমার কোমরের ৪ ও ৫ নম্বর ডিস্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু আমি দমে যাইনি, আমার উপলব্ধি হচ্ছিল—আমার সহযোদ্ধারা জীবন দিচ্ছে, সে জায়গা আমি এখনও বেঁচে আছি। আহত হওয়ার পর ডা. শাহ আমান উল্লাহ বর্তমানে ড্যাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমাকে চিকিৎসা দেন। আমি এখনও পুরোপুরি সুস্থ হইনি। হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথা যেন মৃত্যু যন্ত্রণাকেও হার মানায়। এর থেকে সাময়িক নিরাময়ে যেন ফিজিওথেরাপি আমার শেষ সম্বল। আমার পরিবার যখন জানতে পারে, আমি আবার আন্দোলনে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে আহত হয়েছি। তখন আমাকে বারণ করলেও আমি আন্দোলনে অংশগ্রহণ চালিয়ে যেতে থাকি।
‘সর্বশেষ ৫ আগস্ট সকালটা ছিল ভীষণ নাটকীয়’
তামিম ইকবাল বলেন, সকাল ১০টায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত গ্রামীণফোনের অফিসে সামনে এসে জড়ো হয়ে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হতে চাইলে ভাটারা থানার পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি করতে থাকে এবং টিয়ারগ্যাস ছুড়তে থাকে। টানা দুই ঘণ্টা গুলি চালাতে চালাতে আমাদের টপটেনের মোড় ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। পুলিশের গুলি শেষ হওয়া মাত্রই আমরা পুলিশকে ধাওয়া দিলে তার পিছু হঠতে বাধ্য হয়।
দুপুর ১২টায় আমরা বসুন্ধরা গেট অভিমুখে আসামাত্রই দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সাঁজোয়া যানে করে আসে এবং আমরা সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে উঠে পড়ি, তাদের সঙ্গে কোলাকুলি করি। একটা আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
আক্ষেপ ও চলমান লড়াই
জুলাই যোদ্ধা তামিম ইকবাল বলেন, হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবারও স্বাধীন হলেও তামিমের বুকে রয়ে গেছে এক তীব্র আক্ষেপ। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দেয়—আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। আর একটি গুলিও আপনাদের দিকে ছোড়া হবে না। তারপর মিডিয়ার (গণমাধ্যম) মাধ্যমে জানতে পারি, খুনি হাসিনা পালিয়েছে।
তামিম ইকবাল আরও বলেন, আমরা বলি—গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, আমরা স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে—প্রায় দুই হাজারের অধিক শহীদ, ২০ হাজার আহতের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। জুলাইয়ের স্পিরিটকে ধারণ এবং সর্বোপরি প্রতিষ্ঠা করতে আমরা এখনও নীরব আন্দোলন করে যাচ্ছি। সরকারকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি। গণতন্ত্রের আপসহীন ধারাবাহিকতা এবং জুলাইয়ের অর্জনকে প্রতিষ্ঠিত করতে এখনও নীরব আন্দোলন করেই চলেছি। তাই জুলাইয়ের মৃত্যুপুরী থেকে বেঁচে ফিরলেও আর ঘরে ফেরা হয়নি।

মোঃ জাকের হোসেন (Md Zaker Hossain)