পাঁচবার ঘর সরিয়েও রক্ষা হয়নি উমেশের
‘নদীর সঙ্গে আর কত যুদ্ধ করমু? পাঁচবার ঘর সরাইছি। শেষ সম্বল দিয়া পাকা ঘর বানাইছিলাম। নদী সেটাও খাইয়া ফেলতাছে। এখন আর যাওয়ার মতো জায়গা নাই।’ কথাগুলো বলতে বলতে পায়রা নদীর দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন পটুয়াখালী সদর উপজেলার ইটবাড়িয়া ইউনিয়নের চাঁন্দোখালী গ্রামের ৭৭ বছর বয়সী উমেশ চন্দ্র বয়াতি। কয়েক দিন আগেও যেখানে ছিল তার গোয়ালঘর, সেখানে এখন শুধু নদীর উত্তাল ঢেউ। ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে তার বসতঘরও।
প্রায় ছয় দশক ধরে নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করছেন উমেশ চন্দ্র। ইতোমধ্যে পাঁচবার বসতঘর সরাতে হয়েছে তাকে। সর্বশেষ ২০২২ সালে সঞ্চয়, ঋণ ও স্বজনদের সহযোগিতায় একটি পাকা ঘর নির্মাণ করলেও সম্প্রতি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে সেই ঘরের একাংশ ও গোয়ালঘর। বর্তমানে বেড়িবাঁধের পাশে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তিনি।
উমেশ চন্দ্র বলেন, ছোটবেলা থেইকা এই নদীর পাড়ে আছি। নদী আমার জমি, ঘর, গাছ সব নিছে। সরকার যদি এখন ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আর কিছুই থাকবে না।
চাঁন্দোখালী গ্রামের মতো একই চিত্র জেলার কলাপাড়া, গলাচিপা, দশমিনা, বাউফল ও দুমকী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। পায়রা, তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর ভাঙনে প্রতিবছর বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও সড়ক।
স্থানীয় বাসিন্দা ছালমা বেগম বলেন, দিন-রাত আতঙ্কে থাকতে হয়। কয়েক শতক জমি নদীতে চলে গেছে, এখন বসতভিটাও ঝুঁকিতে।
আনোয়ার হোসেন বলেন, কয়েকবার বাড়ি সরিয়ে এখন তিনি নিঃস্ব। অন্যদিকে, কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামে নদীভাঙনের মুখে পড়েছে এলাকার একমাত্র যোগাযোগ সড়ক, যা ভেঙে গেলে কয়েক হাজার মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা হলেও স্থায়ী নদীশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী জেলায় প্রায় ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৪২০ কিলোমিটার বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ। জোয়ার ও তীব্র স্রোতের কারণে এসব এলাকার ঝুঁকি বাড়ছে।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফ হোসেন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে। স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে পর্যায়ক্রমে টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

কাজল বরণ দাস, পটুয়াখালী