রোহিঙ্গা সংকট রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফল, রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান হতে হবে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, রোহিঙ্গারা ঘটনাক্রমে রাষ্ট্রহীন হয়নি, বরং পরিকল্পিতভাবে তাদের রাষ্ট্রহীন করা হয়েছে। এটি একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবেই হতে হবে।
ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় ৩৩তম আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের (এআরএফ) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।
এ সময় রাখাইন রাজ্যে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গার নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিতকল্পে বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতি মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান ড. খলিলুর রহমান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “রোহিঙ্গারা পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্রহীন নয়, তাদের পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রহীন করা হয়েছে। এটি একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা, যার জন্য রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।”
আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নিজের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে ড. খলিলুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংলাপ ও কূটনীতির বিকল্প নেই।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইউএনবিকে জানান, প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে, যা দেশের ওপর উল্লেখযোগ্য সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের প্রতি কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়ে আসছে, যাতে রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়।
এ সময় সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট সব রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান ড. খলিলুর রহমান।
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়ে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রস্তুতি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উদীয়মান প্রযুক্তির সুবিধা এবং ঝুঁকির কথা তুলে ধরে ড. খলিলুর রহমান এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ও উন্নয়ন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আঞ্চলিক প্রযুক্তি শাসন কাঠামো (টেকনোলজি গভর্ন্যান্স ফ্রেমওয়ার্ক) গঠনের প্রস্তাব দেন।
সফরের অংশ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পর্যটন, মানবিক সহায়তা, বহুপাক্ষিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতাসহ দ্বিক্ষিক ও বহুক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
এ সময় বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং দায়িত্ব পালনে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এদিকে, এআরএফ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ড. খলিলুর রহমান। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরস্পর শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
ড. খলিলুরের সঙ্গে বৈঠকের পর সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণন বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন স্বার্থ এবং জনগণের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্কের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ও বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে দুই দেশ কীভাবে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং আসিয়ানের মাধ্যমে যৌথভাবে কাজ করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও পর্যটনমন্ত্রী বিজিথা হেরাথের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বহুপাক্ষিকতা, শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির প্রতি উভয় দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
এর আগে, বুধবার এআরএফ বৈঠকের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন ড. খলিলুর রহমান।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এসব বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
৩৩তম আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তির (টিএসি) ৫০তম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. খলিলুর রহমান। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়াতে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছে এআরএফ প্ল্যাটফর্ম।

ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)