মেট্রোরেলের জন্য মায়াকান্না, আরও ফুঁসে উঠে ছাত্র-জনতা
কোটা আন্দোলন ততদিনে রূপ নিয়েছে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। রাজপথে মৃত্যুর মিছিলের মধ্যেই ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যান ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রো স্টেশন পরিদর্শনে। একপর্যায়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, যা ছাত্র-জনতাকে আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোতেও উঠে আসে সেই খবর। সেদিন শেখ হাসিনার কান্নাকে ‘মায়াকান্না’ বলে অভিহিত করা হয়।
ছাত্র-জনতার প্রতিক্রিয়ায় উঠে আসে, অনেক শিক্ষার্থী ও নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অনেকে। তাদের প্রতি কোনো আবেগ বা সহমর্মিতা দেখাননি শেখ হাসিনা। অথচ মেট্রোরেল স্টেশনের ক্ষতি নিয়ে তিনি মায়াকান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তার এমন কর্মকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। যদিও শেখ হাসিনার সমর্থকেরা বলতে থাকেন, এই কান্না ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের ঘটনায় একজন সরকারপ্রধানের মানবিক প্রতিক্রিয়া।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছিল পুরো দেশ। সংঘর্ষ, সহিংসতা ও প্রাণহানির সেই সময়ে মেট্রোরেলের মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ১৯ জুলাই (শুক্রবার) বিকেলে দুটি স্টেশনে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে টিকিট বিক্রির মেশিন, প্রবেশ গেট, সিসি টিভি ক্যামেরা, কম্পিউটার, মনিটরিং ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ভেঙে ফেলা হয়। দুই স্টেশনের অনেক স্থানে আগুন দেওয়া হয়। এতে মেট্রোরেল সেবা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ২০ জুলাই থেকে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সেই সময়ে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে থাকা এম এ এন ছিদ্দিক বলেছিলেন, ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশন দুটি মেরামতের পর পুনরায় চালু করতে ১ বছরের মতো সময় লাগতে পারে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট থেকেই মেট্রোরেল চলাচল শুরু হয়। একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর কাজীপাড়া এবং ১৫ অক্টোবর মিরপুর-১০ স্টেশন ফের যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ মেট্রোরেলের ক্ষয়ক্ষতির প্রসঙ্গে তৎকালীন সরকার জানিয়েছিল, দুটি স্টেশন পুরোপুরি সচল করতে ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। যদিও আওয়ামী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুটি স্টেশন মাত্র ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামতের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
মেট্রোরেলের ক্ষতি নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি এবং গণমানুষের ভোগান্তির কারণ হয়েছিল। একইসঙ্গে জুলাই ২০২৪ আন্দোলনে বহু মানুষের প্রাণহানি ও অসংখ্য পরিবারের শোক বাংলাদেশের ইতিহাসে বেদনার স্মৃতি। জুলাই ২০২৪ সেই দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি মানুষের জীবন সবচেয়ে মূল্যবান। একটি ভাঙা স্টেশন সময় ও অর্থ দিয়ে নির্মাণ করা যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া একটি প্রাণ কখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক