জাতির উদ্দেশে ভাষণে যা বলেছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তীব্র আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা থেকে উৎখাত হন বজ্রকঠিন হাতে দেশ চালানো শেখ হাসিনা। শুধু উৎখাতই নয়, দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয় ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে।
সেদিন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ছাত্র-জনতার ঢেউ আছড়ে পড়ে। গণঅভ্যুত্থানের বিজয় উদযাপন করেন তারা। সেই সঙ্গে অবসান ঘটে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের নারী সরকার প্রধানের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনেরও।
শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা গণভবন থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। তার আগে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এরপরই অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের লক্ষ্যে সেনাপ্রধান, নৌ-প্রধান, বিমানবাহিনীর প্রধান এবং দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বঙ্গভবনে বৈঠক করেন সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করা হয়। বৈঠকে অনতিবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
বঙ্গভবনের এ বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে অনতিবিলম্বে মুক্তির সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে এবং সে বৈঠক শেষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
মো. সাহাবুদ্দিন তার ভাষণে বলেন, আপনারা জানেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আজ বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়কদের সাথে আলোচনা হয়। শুরুতেই সেনাপ্রধান বিরাজমান সার্বিক পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তার আলোচনা সম্পর্কে আমাকে অবহিত করেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও এসময় তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
সভায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। এছাড়া জরুরি ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সকল দল ও অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যত দ্রুত সম্ভব সাধারণ নির্বাচন করবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় আটকসহ সকল বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নিহতদের পরিবারদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও আহতদের সুচিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সকল সহায়তা দেওয়া হবে। সর্বসম্মতিক্রমে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ
“প্রিয় দেশবাসী,
আমি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং লুটতরাজ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। জনগণের জানমাল ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করছি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।
দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও শিল্প কল-কারখানা চালু রাখার লক্ষ্যে সকলকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাই। ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষকদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে অতি শিগগিরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হবে। এছাড়া যারা হত্যা ও সহিংসতার সাথে জড়িত, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী অনতিবিলম্বে বর্তমান সংসদ বিলুপ্ত করা হবে।
দেশের সকল অফিস আদালত আগামীকাল থেকেই স্বাভাবিকভাবে চলবে।
প্রিয় দেশবাসী,
আসুন আমরা দেশকে বাঁচাতে একযোগে কাজ করি। পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ও প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে এগিয়ে নিতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার জন্য আমি সবাইকে বিনয়ের সাথে আহ্বান জানাচ্ছি।
একটি সুন্দর ও সোনালী ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় আমরা এগিয়ে যাবো- ইনশাল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
খোদা হাফেজ, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।”

সোহরাব হোসেন