১৪ দিনের আয়েশা দেখতে পাবে না বাবার মুখ
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গণ্ডগোহালীতে রুবেলের ১৪ দিন বয়সের সন্তান আয়েশা আর কোনো দিন দেখতে পাবে না বাবার মুখ। কারণ সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে তিনি মারা গেছেন।
নিহত রুবেল হোসেনের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, হামার তো আর দুনিয়ার বুকে কেউ থাকল না বাবা। হামার নাতনি হছে, কেবল ১৪ দিন হলো। ছাওয়ালের বাপে নাম রাকিছে আয়েশা। দুনিয়ার বুকে তো হামাক আর দেখার মতো আর কিছু থাকল না বাবা! বাবা আমার ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে দুনিয়া থ্যাকা চলা গেল। ১৪ দিনের ছাওয়ালের মুখটা দেখার ভাগ্য তার হলো না।
আজ সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গণ্ডগোহালীতে রুবেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম বিরাজ করছে পরিবারে।
এর আগে গতকাল রোববার দুপুর ২টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে রুবেল হোসেন মারা যান। এ ছাড়া এই গ্রামের আরও তিনজন এই ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, ‘হঠাৎ করে রোববার মাগরিবের আজানের মনে হয় পাঁচ-সাত মিনিট পরেই, হামার কাছে এক মানুষ আসে দৌড়ে। আসে কয়, ‘এরে মফতুল, তোর ব্যাটা নাকি ওটি মরে গেছে! আগুন লাগিছে কারখানাত!’ তখন তো হামি আর হামার মধ্যে নাই! হামি মানুষ, তখন তো মনে হয় দুনিয়ার থ্যানে হামি চলে গেছি। বাবারে, তোরা দেখ তো বাবা! হামার ছাওয়ালের কী হলো? আমার ছাওয়ালটা কুন্টি গেল।’
মোহাম্মদ সাইদুর রহমান আরও বলেন, হামার রুবেলের নয় বছর হচ্ছে সৌদি যাওয়ার বয়স। সাড়ে ছয় বছর পরে ছুটিতে আইছিল। আসার পরে ছাওয়ালোক আবার বিয়া দিনু। বিয়া করে আবার গেল সৌদি আরব। যেয়ে দুই বছরকার মাথাত আবার আলো বাড়িত। আসে ছয় মাসের ছুটি কাটায়ে গেল। ছয় মাস ছুটি কাটায়ে যায়ে কেবল তিন মাস হলো। ওটি যায়ে সোফা সেটের কাজ করে হামার ছাওয়াল। হামি মানা করি, বাবা, ওই কাম তুই করিস না, ওই কাম কষ্টের কাম। ছাওয়াল হামাক কয় আব্বা, হামার এটি সুবিধা হয়। এটি হামার নিজের মানুষ সব আছে। কথাবার্তা বাংলায় কওয়া যায়। আর অন্যটি আরবির সাথে হামার কথা কওয়ার অভ্যাস নাই। এটিই হামার ভালো আব্বা।’
মোহাম্মাদ সাইদুর রহমান আরও বলেন, হামরা সরকারের কাছে কী চামো? হামরা গরিব মানুষ। আর সরকারের কাছে চাওয়ার কী, হামার ছাওয়ালটাক দয়া করে হামার সমানে যেন পৌঁছায়ে দেয়, এটাই হামার সরকারের কাছে দাবি বা অনুরোধ। ওই সময় নয় লাখ টাকা ধারদেনা করে দিয়ে ছাওয়ালেক সৌদি আরব পাঠাছুনু। কিছু পরিশোধ হছে, কিছু এখনো বাকিও আছে। জমি বেচে, ধারদেনা করে টাকা দিয়ে হামার ছাওয়ালেক সৌদি আরব পাঠাছুনু।’
সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা এলাকার ওই সোফা কারখানায় ১৬ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ১২ জনের বাড়িই নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে আর একজনের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলার পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস মহল্লায়।
আত্রাই উপজেলার নিহতরা হলেন উপজেলার বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের মৃত বাদলের ছেলে সুমন হোসেন (৩৫) ও চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ (২৭), কালিকাপুর ইউনিয়নের গণ্ডগোহালি গ্রামের গাফফফার প্রামাণিকের ছেলে মহন প্রামানিক ও সুমন প্রামানিক, একই গ্রামের জান্নারের ছেলে রুবেল হোসেন (৩০) ও বজলুর প্রামাণিকের ছেলে কলিম উদ্দিন প্রামাণিক (৩৫), পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল জলিল (৩৮), বিশা গ্রামের আজহারের ছেলে সাগর (৩১) ও একই গ্রামের মজনুর ছেলে মজিদুল (৩৪) , উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে ফরিদ শেখ (৩২),আত্রাই উপজেলার বোয়ালা গ্রামের মিনহাজ ও হৃদয় এবং নওগাঁ সদর উপজেলার পুরাতন রেজিস্টি অফিস এলাকার মজনুর রহমানের ছেলে মো. শাহিন হোসেন।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার এখন পর্যন্ত ১২ জন এবং সদর উপজেলায় একজনসহ ১৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। মরদেহ ফিরিয়ে আনতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ