দুই সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ ময়না খাতুন
‘চলে যাচ্ছি মা, আর কথা হবে না।’ সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় আগুন লাগার আগে মাকে দেওয়া মোহন প্রামাণিকের শেষ অডিও বার্তা এটি। ছেলের কণ্ঠের সেই শেষ কথাই এখন বারবার মনে পড়ছে মা ময়না খাতুনের। শেষ স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।
গতকাল সোমবার (১০ আগস্ট) নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মোহনের বাড়িতে মানুষের ভিড়। মোহন প্রামাণিক ও তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিককে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ বাবা গাফফার প্রামাণিক। সন্তান হারানোর শোকে বারবার কান্নায় মূর্ছা যাচ্ছেন মা ময়না খাতুন।
বাড়ির চারপাশে পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী। অসমাপ্ত বাড়ির কাজ শেষ করে দেশে ফিরে শিগগিরই বিয়ে করার কথা ছিল মোহনের। সেই স্বপ্নও আর পূরণ হলো না।
স্থানীয় সময় রোববার দুপুরের দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় এবং একজনের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলায়। বাকি তিনজনের বাড়ি নাটোর জেলায় বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন আত্রাইয়ের নিহত ১২ জন। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করা, সংসারের দেনা শোধ করা এবং একসময় দেশে ফিরে স্বজনদের নিয়ে স্বচ্ছন্দ জীবন কাটানোর স্বপ্ন ছিল তাদের। কেউ হয়তো সেই স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। কিন্তু রিয়াদের আগুনে মুহূর্তেই থেমে গেল তাদের জীবন। অধরাই রয়ে গেল স্বপ্নগুলো।
গন্ডগোহালী গ্রামের মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক ছিলেন সহোদর ভাই। দুই ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই তাদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। ছেলেদের ছবি হাতে নিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন বাবা গাফফার প্রামাণিক। আর সন্তান হারানোর শোকে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা ময়না খাতুন।
ময়না খাতুন বলেন, মৃত্যুর আগে মোহন তাকে মোবাইলফোনে একটি অডিও বার্তা পাঠিয়েছিল। সেখানে বলেছিলেন, ‘চলে যাচ্ছি মা, আর কথা হবে না।’ ছেলের সেই শেষ কথাই এখন বারবার তার কানে বাজছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ করে দেশে ফিরে মোহনের বিয়ে করার কথা ছিল। বাড়ির চারপাশে পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী এখন সেই স্বপ্নেরই সাক্ষী হয়ে আছে। ছেলেদের মরদেহ একবার দেখতে চান মা ময়না খাতুন।
একই গ্রামের কলিম উদ্দিন প্রামাণিকও ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন। প্রায় আট বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তার মা কারিমা বেগম।
কারিমা বেগম বলেন, ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের কথা মনে পড়লেই তার বুক ফেটে যায়। এখন তার একটাই ইচ্ছা- ছেলের মরদেহ দেশে এনে একবার নিজের চোখে দেখা এবং পরিবারের নিজস্ব কবরস্থানে দাফন করা।
‘মাগরিবের আজানের পাঁচ-সাত মিনিট পর হঠাৎ একজন দৌড়ে এসে কইল, ‘মফতুল, তোর ব্যাটা নাকি ওইখানে মরে গেছে! কারখানায় আগুন লাগছে।’ কথাটা শুনে তখন আমি আর নিজের মধ্যে ছিলাম না। মনে হইছিল, দুনিয়ার থ্যানে আমি চলে গেছি। বাবা, তোরা দেখ তো, আমার ছাওয়ালের কী হলো! আমার ছাওয়ালটা কনে গেল?’
ছেলে রুবেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর এভাবেই বিলাপ করছিলেন বাবা মোহাম্মদ সাইদুর। সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন তার ছেলে রুবেল হোসেন (৩০)। তার বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামে।
সোমবার রুবেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ। স্বজনেরা জানান, মাত্র ১৪ দিন আগে রুবেলের একটি কন্যাসন্তান হয়েছে। মেয়েকে রেখে বাবার শেষবারের মতো মুখ দেখাও হলো না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিহতরা পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাদের কেউ দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কাজ করছিলেন। আয় করা অর্থ দিয়ে কেউ সংসারের খরচ চালিয়েছেন, কেউ ঋণ শোধ করেছেন, আবার কেউ দেশে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করছিলেন।
অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে এতজনের মৃত্যুতে আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, নিহতদের মধ্যে কেউ কেউ সৌদি আরবে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই অবস্থান করছিলেন। ফলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইনি জটিলতা যাতে তৈরি না হয়, সে বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডে আত্রাই উপজেলার ১২ জন এবং সদর উপজেলার একজনের মৃত্যুর খবর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
আত্রাই উপজেলার নিহতরা হলেন- বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের মৃত বাদলের ছেলে সুমন হোসেন (৩৫) ও চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ (২৭); কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের গাফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক, জান্নারের ছেলে রুবেল হোসেন (৩০) এবং বজলুর প্রামাণিকের ছেলে কলিম উদ্দিন প্রামাণিক (৩৫); পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল জলিল (৩৮); বিশা গ্রামের আজহারের ছেলে সাগর (৩১) ও মজনুর ছেলে মজিদুল (৩৪); উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে ফরিদ শেখ (৩২); আত্রাই উপজেলার বোয়ালা গ্রামের মিনহাজ ও হৃদয় হোসেন।
নওগাঁ সদর উপজেলার নিহত ব্যক্তি হলেন পার নওগাঁ পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস মহল্লার মজনুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ শাহিন হোসেন।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ