ফরিদপুরে এসিড কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় পুড়ছে ফসলি জমি, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য
ফরিদপুরের কানাইপুরে অবস্থিত বিসিক শিল্পনগরীর একটি এসিড কারখানার নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে ওই এলাকার কৃষি ও জনজীবন। কারখানার বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে এলাকার হাজার হাজার একর জমির উঠতি ফসল ও ধানক্ষেত পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। শুধু ফসলই নয়, বিষাক্ত এই ধোঁয়ার কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে এরই মধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করে দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফরিদপুরের কানাইপুরের বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত এ এ রসায়ন শিল্প লিমিটেডের এসিড কারখানা থেকে রাতের আঁধারে ছড়িয়ে পড়ে কালো ও ঝাঁঝালো ধোঁয়া। আর এই ধোঁয়ার কারণে ওই এলাকাসহ আশেপাশে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে মারাত্মক দূষণীয় পরিবেশ। ফরিদপুর পৌরসভার মহারাজপুর, মৃগিসহ কানাইপুর ও কৃষ্ণনগর ইউনিয়নজুড়ে এই ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার পর আশপাশের মাইলের পর মাইল ফসলি জমির ধান ও গাছপালা বিবর্ণ হয়ে মরে যাচ্ছে। হাজার হাজার একর জমির ধানসহ বিভিন্ন ফসল হারিয়ে কৃষকেরা এখন দিশেহারা।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, কানাইপুরের বিসিক শিল্পনগরীতে বেশ কয়েক বছর আগে এ এ রসায়ন নামে একটি এসিড কারখানা গড়ে ওঠে। কারখানাটি বিষাক্ত কেমিক্যাল উৎপাদন করে রাতে। কারখানার উৎপাদন শুরু হলে এর কেমিক্যালের ঝাঁঝালো গন্ধে এলাকার সাধারণ মানুষ রাস্তায় হাঁটাচলা এমনকি ঘরেও থাকতে পারেন না। দিনে ভালো ফসল ক্ষেত রেখে নিশ্চিন্তে বাড়ি গেলেও কৃষকেরা রাত শেষে ভোরে দেখতে পান সেই ফসলের ক্ষেতসহ সবকিছু লাল বিবর্ণ হয়ে গেছে। রাতে যখন এই এসিড উৎপাদন শুরু হয় তখন এলাকার আকাশ বাতাস অন্ধকারে ঢেকে যায়।
এদিকে এই ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী। এ সময় সেখানে বক্তব্য দেন সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বেনজির আহমেদ তাবরিজ, স্থানীয় প্রতিনিধি লুৎফর রহমান, কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য নান্নু মেম্বারসহ স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা। বক্তারা এসময় বলেন, সরকার যদি অতি দ্রুত এই এসিড কারখানার বন্ধের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে তাহলে কঠিন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে।
ওই এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আব্দুল ওহাব শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধার-দেনা করে জমিতে ধান, মরিচ, পটল চাষ করেছিলাম। কিন্তু এই এসিড কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় চোখের সামনে সব ধান পুড়ে লাল হয়ে গেল। এখন আমাদের না খেয়ে মরার দশা। একই সাথে ওই এসিডের কারণে আমার একটি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি সেই চোখটি দিয়ে এখন ঝাঁপসা দেখি।
ওই এলাকার লুৎফর রহমান বলেন, বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো ক্ষতিকারক গ্যাসের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় গাছের পাতা পুড়ে যাচ্ছে এবং সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে ফসল নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের মাটির ঊর্বরতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরেক কৃষক সবুজ মিয়া বললেন, আমাদের অনেক ধান এবং মরিচ এই এসিডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন কীভাবে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিব বুঝতে পারছি না আমরা। এই ফসলের পাশাপাশি এলাকায় ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিষাক্ত বাতাসের কারণে শ্বাসকষ্ট, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, চোখে জ্বালাপোড়া এবং ত্বকের অ্যালার্জিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু এবং বয়স্কদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য নান্নু মিয়া বলেন, বিষয়টি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে এলাকাবাসী সরকারের বিভিন্ন দপ্তরসহ কারখানার সামনে মানববন্ধন করেছেন। আর এই ঘটনায় সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে রিপোর্ট প্রদান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন বলেছেন, এই এসিড কারখানার ঘটনাটি দুবছর আগে একবার ঘটেছিল। তখন একটি তদন্ত কমিটি তদন্ত করে ওই এসিড কারখানার ধোঁয়ার কারণে এমনটা হচ্ছে বলে রিপোর্ট প্রদান করেছিল। এবারও আমরা এই বিষয়টি আবার জেনেছি। সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি করে দিয়েছেন। কমিটির রিপোর্টের পরেই এই বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
ফসলি জমি ও জীবনমান রক্ষায় অবিলম্বে এই বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গমন বন্ধ অথবা কারখানাটি নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী।

সঞ্জিব দাস, ফরিদপুর