ঢাকায় পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স, সমন্বয়ের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করায় গুরুত্ব
মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন, সময়মতো চার্জশিট দাখিল, মেডিকেল ও ফরেনসিক প্রতিবেদন দ্রুত সংগ্রহ এবং আদালত ও পুলিশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ঢাকার পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্সে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঢাকার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ কনফারেন্সে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়।
ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (ভারপ্রাপ্ত) মো. মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম।
ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তাজুল ইসলাম সোহাগের সঞ্চালনায় কনফারেন্সে জেলার মামলার নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করেন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান।
এ সময় ঢাকার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন, সিআইডির পুলিশ সুপার, জেল সুপার, সিভিল সার্জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিনিধিসহ জেলার বিভিন্ন থানার অফিসার ইনচার্জ, জেলা পিপি, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেটরা উপস্থিত ছিলেন।
কনফারেন্সে মামলার তদন্ত কার্যক্রমে গতি আনা এবং নির্ধারিত সময়ে চার্জশিট দাখিলের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি মামলার প্রয়োজনীয় মেডিকেল ও ফরেনসিক প্রতিবেদন দ্রুত আদালতে পৌঁছানো, আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং আসামিদের সময়মতো আদালতে উপস্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়।
স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলনের মামলার তদন্তে গতি
কনফারেন্সে স্বেরাচার বিরোধী গণআন্দোলন-সংক্রান্ত মামলাগুলোর অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। জানানো হয়, ঢাকা জেলা জজ আদালতে এ ধরনের মাত্র চারটি মামলা বিচারের জন্য এসেছে। এসব মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে আইনানুগভাবে চার্জশিট দাখিলের জন্য জেলার সব থানার অফিসার ইনচার্জকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পুলিশ সুপারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। তদন্তকালে কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের পর্যাপ্ত ভিত্তি না পাওয়া গেলে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়।
মেডিকেল-ফরেনসিক প্রতিবেদন দ্রুত পাওয়ার তাগিদ
ভিকটিমদের মেডিকেল সার্টিফিকেট (এমসি) ও ফরেনসিক প্রতিবেদন দ্রুত প্রাপ্তির বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। মেডিকেল প্রতিবেদন চাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট থানা থেকে যথাযথ রিকুইজিশন পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। চিকিৎসাদানকারী চিকিৎসক বর্তমানে কর্মরত না থাকলে সংশ্লিষ্ট পদে কর্মরত চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বোর্ড গঠন করে যথাযথ স্বাক্ষরের মাধ্যমে দ্রুত প্রতিবেদন দেয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।
হত্যা মামলায় মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সুরতহাল প্রতিবেদন, জব্দ তালিকা ও পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন সময়মতো আদালতে না আসার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মামলা দায়েরের পরপরই সুরতহাল প্রতিবেদন ও জব্দ তালিকা এবং পরবর্তীতে পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন যথাসময়ে আদালতে পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়।
ডিজিটাল আলামত জব্দে সতর্কতার নির্দেশ
কনফারেন্সে ডিজিটাল আলামত ও ইলেকট্রনিক সাক্ষ্য যথাযথভাবে জব্দ, সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়। সিসি ক্যামেরার ডিভিআরসহ সংশ্লিষ্ট ডিভাইস যথাযথভাবে জব্দ এবং মোবাইল ফোন জব্দের সময় সিমের তথ্য ও আইএমইআই নম্বর সঠিকভাবে নথিভুক্ত করার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়। এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি ও স্বীকারোক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে আইনগত শর্ত, স্বেচ্ছাস্বীকৃতি ও নির্ধারিত পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
পরোয়ানা তামিল ও সম্পূরক অভিযোগপত্র
দীর্ঘদিন ধরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল না হওয়ার বিষয়েও কনফারেন্সে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দ্রুত পরোয়ানা তামিল এবং সংশ্লিষ্ট আসামিদের গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পুলিশ রিপোর্ট দাখিলের পর আসামির নাম বা ঠিকানায় ভুল ধরা পড়লে আইনানুগভাবে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়েও আলোচনা হয়। সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়ার সময় মূল অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত কোনো আসামি যেন বাদ না যায়, সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম।
আদালত ভবনের লিফট নিয়ে অভিযোগ
কনফারেন্সে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের চারটি লিফটের নিম্নমান ও ঘন ঘন বিকল হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী এবং আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলাচলের সুবিধার্থে দ্রুত সমস্যা সমাধান ও উন্নতমানের লিফট সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম বিভাগ) সমস্যাটি দ্রুত নিষ্পত্তির আশ্বাস দেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালতে পুলিশি সহায়তা
বিশুদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ ধরনের অভিযান পরিচালনাকারী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত পুলিশ ফোর্স দিয়ে সহযোগিতা করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় মেডিকেল পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়। পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে মেডিকেল পরীক্ষার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। ভিকটিমের মেডিকেল পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে বিবেচনা করে মামলা গ্রহণ ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
এপিপিদের নিয়মিত উপস্থিতির ওপর জোর
সভায় অধিকাংশ আদালতে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটরদের (এপিপি) নিয়মিত উপস্থিত না থাকার বিষয়টি উঠে আসে। আদালতের কার্যক্রম সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে পরিচালনার স্বার্থে এপিপিদের নিয়মিত ও যথাসময়ে আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ঢাকা জেলা জজ আদালতের পিপির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন পিপির পক্ষের প্রতিনিধি।

নিজস্ব প্রতিবেদক