মোহাম্মদপুরে গুলিতে ৯ জনকে হত্যা : ট্রাইব্যুনালে রোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন প্রত্যক্ষদর্শী
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে ৯ জনকে হত্যার মামলায় রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন সাক্ষী মামুন ফরাজি (৩১)। অষ্টম সাক্ষীর জবানবন্দিতে তিনি বলেন, তার চোখের সামনে এক আন্দোলনকারীকে টেনেহিঁচড়ে বের করে গুলি করা হয় এবং গুলিবিদ্ধ ওই যুবকের পেট থেকে রক্তমাখা ভাত বেরিয়ে আসতে দেখেন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার এই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৮ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মামুন ফরাজি। তার বাড়ি পিরোজপুরে। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশি গুলিতে আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার দৃশ্য দেখে বিবেকের তাড়নায় তিনিও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন।
জবানবন্দিতে মামুন ফরাজি বলেন, ১৮ জুলাই আসরের নামাজের পর মোহাম্মদপুর আল্লাহ করিম মসজিদের কাছে ময়ূর ভিলার সামনে তারা আন্দোলনে যোগ দেন। তখন বিপরীত দিক থেকে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারীরা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ‘পাখির মতো’ গুলি চালান। আহতদের রিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মামুন ফরাজি আরও বলেন, ১৯ জুলাই (শুক্রবার) ছুটির দিন হওয়ায় সকাল থেকেই তিনি আন্দোলনে অংশ নেন। শ্যামলীতে গিয়ে দেখেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছেন। পরে আসাদগেটে আড়ংয়ের বিপরীতে পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নকে (এপিবিএন) গুলি চালাতে দেখেন। এ ছাড়া আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে পুলিশ ও র্যাবকে বিরিয়ানি খেতে এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের অস্ত্র হাতে তাদের পাহারা দিতে দেখেন তিনি।
সাক্ষী মামুন ফরাজি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে বাঁশবাড়ি এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশ, আনসার, র্যাব ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মুহুর্মুহু গুলি শুরু করেন। তখন তারা জননী কুরিয়ার সার্ভিসের গলিতে আশ্রয় নেন। সেখানে ওরিয়েন্টাল কোভান নামের একটি আবাসিক ভবনের গেটের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া রাজু নামের এক আন্দোলনকারীকে টেনেহিঁচড়ে বের করেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। এরপর তাকে গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ রাজুকে জননী কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে আনলে দেখা যায়, তার পা ও পেটে গুলি লেগেছে এবং পেট থেকে রক্তমাখা ভাত বেরিয়ে আসছে। দ্রুত তাকে মোটরসাইকেলে হাসপাতালে পাঠানো হলেও ১৯ জুলাই তিনি মারা যান।
রাজুকে গুলি করা আনসার সদস্যের নাম ওমর ফারুক বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান সাক্ষী মামুন ফরাজি।
জবানবন্ধিতে মামুন ফরাজি আরও বলেন, সন্ধ্যা ৬টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিবর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় মূল রাস্তায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মেহজাবিন বিউটি পার্লারের সামনে একটি বিদ্যুতের খুঁটির পেছনে আশ্রয় নিয়ে তিনি দেখেন, জসিম নামের এক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছেন। জসিমের হাতে ও বুকে গুলি লেগেছিল। তার রক্তে মামুনের নিজের পরনের কাপড়ও ভিজে যায়। রনি ফার্মেসিতে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এবং নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করার পর জসিমকে রিকশায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ২৯ জুলাই বক্ষব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জসিম মারা যান।
২২ জুলাই মোহাম্মদপুর ফুটওভার ব্রিজের নিচে টিয়ারশেলে আহত হওয়ার পর আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান সাক্ষী মামুন ফরাজি। মোহাম্মদপুরে দীর্ঘদিন বসবাসের সুবাদে আসামিদের ব্যক্তিগতভাবে চেনেন উল্লেখ করে তিনি তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা, ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, বিপ্লব কুমার সরকার ও রওশানুল হকের নির্দেশে চালানো এসব অপরাধের জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দায়ী করেন এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
ট্রাইব্যুনালে আজ প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। তাকে সহযোগিতা করেন প্রসিকিউটর মামুনুর রশিদ ও সুলতান মাহমুদসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।
এ মামলায় অভিযুক্ত ২৮ আসামির মধ্যে বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক ও যুবলীগ কর্মী ফজলে রাব্বি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক