প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান, যোগ দেবেন ট্রাম্পের নৈশভোজে
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে আগামীকাল সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের।
সফরসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন তিনি। আন্তর্জাতিক বিশ্বমঞ্চে এটিই হতে যাচ্ছে তার প্রথম ভাষণ। এই ভাষণে তিনি ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধান, বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারমূলক সংস্কার কার্যক্রম এবং দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের সার্বিক চিত্র তুলে ধরবেন। নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা স্বাগত মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করবে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি।
কূটনৈতিক ব্যস্ততা ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক
সোমবার নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে উঠবেন। সফরকালে একাধিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সফরকালে ২৩ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। ব্যয় কমাতে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। ভাষণ দেওয়ার পর ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে দেশে ফেরার কথা রয়েছে তার।
জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক
সফরের শুরুতেই জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক করবেন তারেক রহমান। বৈঠকে বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের বিশেষ অবদান, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হবে।
সাইডলাইন সম্মেলন
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার একাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে তাঁর সাইডলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ স্থান পাবে।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, সফরকালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চারনভিরাকুল, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ আল-খালেদ আল-সাবাহ, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচ এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টনিও কোস্তা, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডন নেলসনের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা রয়েছে।
সফরকালে ২৩ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
উচ্চপর্যায়ের ইভেন্ট
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পর্যালোচনা, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং বিশ্বজুড়ে দেখা দেওয়া খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জবিষয়ক আলোচনায় তিনি অংশগ্রহণ করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করার রূপরেখা ঘোষণা করবেন। ২০০০ সালে অনুস্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) আলোকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিতে বর্তমান সরকারের গৃহীত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করবেন।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ব্যাপক প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে জেএফকে বিমানবন্দরে জমায়েত এবং নিউইয়র্ক শহরজুড়ে ব্যানার ও পোস্টার টাঙিয়ে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, যুবদল ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারা। পাশাপাশি বিমানবন্দরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অপ্রীতিকর কোন কিছু ঠেকাতে বিভিন্ন স্তরে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নেতারা।
পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। তাঁর বাবা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, ১৯৮০ সালের আগস্টে জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বাংলায় ঐতিহাসিক বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। সেই ভাষণে তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক মুক্তি ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জোর দেন। তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয় ২০০৫ সালের বিশ্ব সম্মেলনসহ (ওয়ার্ল্ড সামিট) জাতিসংঘের একাধিক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন এবং গণতন্ত্র ও সার্বজনীন মানবাধিকারের বিষয়গুলো বিশ্ব দরবারে সোচ্চারভাবে তুলে ধরেন।
বাবা ও মায়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিএনপির জাতীয় নেতৃত্বের উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান এবার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করবেন।

জাকের হোসেন, নিউইয়র্ক থেকে