‘জন্ম-মৃত্যু আল্লাহ প্রদত্ত, বিচার আমরাও চাই’
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এহসানুল ইসলাম এই আদেশ দেন।
ঢাকার সিএমএম আদালতে আজ বিকেল ৩টায় কড়া পুলিশি পাহারায় আসামি গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হাজির করে পুলিশ। এসময় তাদের মাথায় হেলমেট এবং শরীরে বুলেফপ্রুফ জ্যাকেট পরানো ছিল।
আদালতে আসামিদের তোলার পরে বিচারক এজলাস গ্রহণ করেন। এরপরে মামলার রিমান্ড শুনানি শুরু হয়। প্রথমে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি পাঁচ কারণ দেখিয়ে আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, ভিকটিম মরিয়ম ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যুবরণ করার সময় একই বাসায় এজাহারনামীয় গ্রেপ্তার আসামিরা ছিল। তাই ভিকটিমের আত্মহত্যায় তাদের প্রভাব আছে কি না তা উদঘাটন করার জন্য তাদেরকে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।
শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, ভিকটিমকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোনোভাবে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার বিষয়ে আসামিদের ভূমিকা উদঘাটন করার জন্য এবং ভিকটিম মরিয়মের আত্মহত্যায় এজাহারনামীয় পলাতক আসামি ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করার জন্য রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এছাড়া ভিকটিম মরিয়মের আত্মহত্যায় অজ্ঞাতনামা আসামি জড়িত রয়েছে কি না তা শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা ও মামলার মূল রহস্য উদঘাটন করতে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
শুনানির পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, মাননীয় আদালত, আসামি মুক্তিযোদ্ধা, সংসদ সদস্য, ৭৫ বছরের বয়স্ক এবং সংসদের আইনপ্রণেতা। তাই আমরা আজকে তার জামিন চাইছি। এসময় আইনজীবী বলেন, মৃত্যুর একটা ঘটনা ঘটেছে, আল্লাহর হুমুক ছাড়া হয় নাই। জন্ম-মৃত্যু আল্লাহ প্রদত্ত। তবে মৃত্যুর বিচার আমরাও চাই। তবে উনারা (নজরুল ও তার স্ত্রী) এই ঘটনায় জড়িত না।
আইনজীবী বলেন, ঘটনাটি আত্মহত্যা। এখানে আলামত জব্দ আছে। গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত আসামি আমার চেম্বারে ছিল। আসামি এটার সাথে জড়িত না। আমরা উনার রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন চাইছি। তিনি আরও বলেন, পুলিশ যে পাঁচ কারণে রিমান্ড বাতিল চাইলো তা আমার উপরে বর্তায় না। আসামি ন্যাম ভবনের বাসিন্দা, তিনি পালিয়ে যাবেন না।
এরপরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি মো. ওমর ফারুক ফারুকী শুনানিতে বলেন, নিহতের বাবা পেশায় একজন মুদি দোকানি। তার বয়স ৪০ বছর আর নিহতের বয়স ১৯ বছর। নিহতের মামা এই আসামির ড্রাইভার ছিলেন। তার মাধ্যমে নিহতের সঙ্গে আসামির পরিচয়। এরপর বিভিন্ন কলা কৌশল, প্রলোভন দেখিয়ে তাকে স্ত্রী হতে বাধ্য করেছেন। প্রথম স্ত্রীকে বিষয়টি গোপন করে বিভিন্ন হোটেল-মোটেলে যান। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় একটি মামলাও হয়।
আইনজীবী ফারুকী বলেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় বেশ কিছু সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। সেখানে নিহতের মৃত্যুর কারণ উল্লেখ আছে। এটা আত্মহত্যা নাকি হত্যা এখনও পরিষ্কার না। হত্যার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নিহতের সঙ্গে পরিচয়ের পর বিয়েতে বাধ্য করার পরিকল্পনা, ন্যাম ভবনে আনা সবকিছুতে একটা পরিকল্পনা ছিল। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এসব উঠে আসবে।
এরপর পিপি পাঁচ কারণে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক আসামি গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের একদিন রিমান্ডের আদেশ দেন।
এজাহার থেকে জানা গেছে, গত জুনে গাজী নজরুলের সঙ্গে ভিকটিমের ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী বিয়ে হয়। তিনি সংসদ সদস্য হওয়ায় ভিকটিম মরিয়ম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামসহ শেরেবাংলা নগর থানাধীন মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকাস্থ সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের ৩য় তলায় বসবাস করত। আসামি ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গাজী নজরুলের সঙ্গে ভিকটিম মরিয়মের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী ভিকটিম মরিয়মকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত বলে বিভিন্ন সময় মোবাইল ফোনে তার পরিবারকে জানায়। এর ধারাবাহিকতায় ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল অনুমান সাড়ে ৫টায় গাজী নজরুল ভিকটিমের বাবাকে মোবাইল ফোনে দ্রুত তাদের বাসায় যেতে বলে। বাসায় এসে দেখতে পান অনেক লোকজন সেখানে উপস্থিত। তখন তিনি জানতে পারেন বাসার ভেতরের রুমে ভিকটিম মরিয়ম ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে রয়েছে। শেরেবাংলা নগর পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তার মেয়ের দেহ ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে রয়েছে দেখতে পান। এসময় বিছানার ওপরে তার লেখা একটি সুসাইড নোট পান। আসামিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং আসামিদের প্ররোচনায় তার মেয়ে মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
এই ঘটনায় গতকাল রোববার মরিয়ম খাতুনের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরে বাংলা নগর থানায় একটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা দায়ের করেন।

শুভ্র সিনহা রায়