আশুলিয়ায় প্রীতি গ্রুপের পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮
সাভারের আশুলিয়ায় প্রীতি গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানার সামনে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি লরিতে বিস্ফোরণের পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ আরও একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল আটজনে। এদের মধ্যে পাঁচজনের শরীর পুরো ঝলসে যাওয়ায় তাদের পরিচয় এখনও শনাক্ত করা যায়নি।
এদিকে দাহ্য পদার্থ অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যবহার করায় বিস্ফোরণ এবং অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগে আশুলিয়া থানায় মামলা করেছে পুলিশ। মামলার বাদী উপপরিদর্শক (এসআই) আবু তালেব।
এতে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম জানায়নি পুলিশ।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম।
রোববার সন্ধ্যায়য় বিস্ফোরণের পর সোমবার এক দিনের জন্য প্রীতি গ্রুপের পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হলেও পরে বন্ধের মেয়াদ আরও বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আজ মঙ্গলবার ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড, প্রীতি কম্পোজিট গার্মেন্টস লিমিটেড, অক্সফোর্ড কালারস লিমিটেড এবং এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড নামের পাশাপাশি অবস্থিত চারটি কারখানা বন্ধ।
গত রোববার সন্ধ্যায় আশুলিয়ার জামগড়ায় প্রীতি গ্রুপের কারখানার পার্কিং এলাকায় সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডার বহনকারী কাভার্ড ভ্যান ও লরিতে বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরিত সিলিন্ডারগুলো ছিটকে গিয়ে কারখানা ভবন, আশপাশের বাসাবাড়ি ও মার্কেটে আছড়ে পড়লে এলাকাজুড়ে তৈরি হয় আতংক।
বিস্ফোরণে ছিটকে যাওয়া সিলিন্ডারের আঘাতে দুজনসহ এ ঘটনায় আট জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন।
ভয়াবহ ওই বিস্ফোরণের পর কারখানা কর্তৃপক্ষ দ্রুত সময়ের মধ্যে পুড়ে যাওয়া গাড়ি ঢেকে ফেলে। পরের দিন ভোরবেলা গণমাধ্যমকর্মীদের কারখানায় প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করে। ঘটনার পর থেকেই আড়ালে চলে যান প্রীতি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজিন আহমেদ তালুকদার। পুলিশ এমন কি প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা দফায় দফায় যোগাযোগ করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। অবৈধভাবে সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডার কারখানার সামনে মজুদ করার বিষয়েও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি। তবে এক বিবৃতিতে প্রীতি কম্পোজিট লিমিটেডের এইচ আর অ্যান্ড কমপ্লায়েন্সের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলমান রয়েছে।
এদিকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির সাভার অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী মো. জাহাংগীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিতরণকারী সংস্থা হিসেবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গ্যাস বিক্রি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল না করার বিষয়ে সর্বোচ্চ সর্তকতা বরাবরই বজায় রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিম বলেন, কারখানায় পাইপলাইনের গ্যাসের তীব্র সংকট থাকায় কার্ভাড ভ্যানের মাধ্যমে সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডার গ্যাস আনা হয়। শিল্পের উৎপাদন বজায় রাখার জন্যই এই কাজটি করা হয়। আমরা তো সরকারকে নিয়মিত বিল দেই। কিন্তু সরকার পাইপলাইনে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে না পারায় বাধ্য হয়ে আমাদের বাড়তি খরচ করে সিএনজি স্টেশন থেকে এভাবে গ্যাস আনতে হয়। গ্যাস পরিবহণে কতটা নিরাপত্তা বজায় রাখা হয় কিংবা কতটা নিরাপদ পরিবেশে তা সংরক্ষণ করা হয় সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
তবে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান বলেন, কাভার্ড ভ্যান বা লরিতে এভাবে গ্যাস সংরক্ষণ ও পরিবহণ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। তিনি বলেন, ‘কাভার্ড ভ্যান বা লরিতে করে গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের কোনো আইনে বা বিধানে এর অনুমতি নেই।’
এদিকে ঘটনাস্থল থেকে ছিটকে আসা বেশ কিছু গ্যাস সিলিন্ডার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে সেগুলো ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। গায়ে লেখা ছিল, ‘ডু নট ইউজ আফটার ২০২১’, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ বছর আগেই এগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল।
প্রীতি গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানার সামনে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি লরিতে বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে মৃতদের পরিবারপ্রতি ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। এদের মধ্যে নিহত পাঁচজনের পরিচয় এখনও শনাক্ত হয়নি। সেই হিসেবে তাদের ওয়ারিশ কে তা নিশ্চিত নয় তাই আপাতত তাদের কেউ ক্ষতিপূরণও পাচ্ছে না।
বিস্ফোরণে বাঁ পায়ের দুটি আঙুল হারানো ট্রাকচালক ওমর সুলতান (৩৮) জানান, কোনো কিছুর বিনিময় তার হারানো আঙুল দুটি ফিরে পাওয়া যাবে না। চিকিৎসার দায়িত্ব কে নেবে তাও নিশ্চিত নয়। কয়েকদিন ধরে সাংবাদিকরা আসবে যাবে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এ পর্যন্তই। আমাদের অবশিষ্ট জীবন অভিশপ্ত হয়ে এভাবেই কাটাতে হবে- আক্ষেপ করেন ওমর সুলতান।

জাহিদুর রহমান