‘১০ টাকার মাস্টার’ এলাহির পাশে খাদ্য সহায়তা নিয়ে ইউএনও
তালপাতায় অক্ষর লেখা, দোয়াত-কালিতে হাতেখড়ি আর কাঠের পাটিতে বসিয়ে শিশুদের পড়ানো—এভাবেই এক সময় গ্রামের শিশুদের শিক্ষাজীবনের সূচনা করতেন মনিরুজ্জামান এলাহি। পারিশ্রমিক হিসেবে নিতেন মাত্র ১০ টাকা। সেই থেকে স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিতি পান ‘দশ টাকার মাস্টার’ নামে।
শিশুদের শিক্ষাজীবনের প্রথম অক্ষর শেখাতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটানো এই প্রবীণ শিক্ষক এখন বয়সের ভারে অনেকটা দুর্বল। জরাজীর্ণ ঘরে আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটছে তার। তার এমন দুরবস্থার খবর পেয়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বাড়িতে ছুটে গেছেন বরিশালের উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা।
আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের হস্তিশুণ্ড গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মনিরুজ্জামান এলাহির সঙ্গে দেখা করেন ইউএনও। এ সময় তার শারীরিক অবস্থা ও পারিবারিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন তিনি। পরে তার হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন তিনি।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রবীণ এই শিক্ষককে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দেন ইউএনও মো. আলী সুজা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকে হস্তিশুণ্ড গ্রামের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের শিক্ষার প্রথম পাঠ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই এলাহি। তালপাতায় লেখা, দোয়াতে কালি তৈরি এবং শিশুদের হাতে ধরে অক্ষর শেখানোর মধ্য দিয়ে শুরু হতো তার পাঠদান।
এলাহির কাছে হাতেখড়ি নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত। তবে একটি প্রজন্মের শিক্ষার সূচনালগ্নে ভূমিকা রাখা সেই শিক্ষকই এখন জীবনের শেষ সময়ে এসে আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছেন।
এইচ এম ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক নুরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘এলাহির কাছে হাতেখড়ি নেওয়া অনেকেই আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। একটি প্রজন্মের জন্য তিনি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন।’
মনিরুজ্জামান এলাহি বিয়ে করেননি। শিক্ষাদানকেই জীবনের বড় অংশজুড়ে সঙ্গী করে অন্যের সন্তানদের শিক্ষার প্রথম অক্ষর চিনিয়েছেন তিনি। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার নেই স্থায়ী কোনো আয়ের উৎস, নেই নিয়মিত সরকারি সহায়তাও। জরাজীর্ণ বাড়িতেই কষ্টে দিন পার করছেন তিনি।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলাহির দুরবস্থার বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে তা উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। এরপর তার খোঁজ নেন ইউএনও মো. আলী সুজা।
ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, “বিষয়টি আমার নজরে আসার পরই আমি ‘১০ টাকার মাস্টার এলাহি’র খোঁজ নিই। আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বাড়িতে এসেছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মনিরুজ্জামান এলাহির হাতে যাদের শিক্ষাজীবনের প্রথম অক্ষর লেখা হয়েছিল, তারাও এবার এই প্রবীণ শিক্ষকের পাশে দাঁড়াবেন। পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদেরও তার সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

কমল পূলক, বরিশাল (উজিরপুর)