নড়াইলে ১১৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই কোনো খেলার মাঠ
পাকা সড়কের একদম গা-ঘেঁষে টানানো সীমানা প্রাচীর। প্রাচীর আর একতলা ভবনের মাঝখানে চিপা একটুখানি সরু খালি জায়গা। সেই ঘিঞ্জি জায়গাতেই ঝুঁকি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে একদল কোমলমতি শিশু। আবার খেলার জায়গা না পেয়ে ক্লাসের বিরতিতে অলস সময় পার করতে বারান্দার সিঁড়ি কিংবা শ্রেণীকক্ষেই বসে থাকছে অনেক শিক্ষার্থী। খেলাধুলার সুযোগ না থাকায় শৈশবের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। নড়াইল জেলার শতশত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাস্তবচিত্র এখন ঠিক এমনই। সরেজমিনে নড়াইল সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের কে শিমুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শিশুদের এই করুণ চিত্র চোখে পড়ে।
কে শিমুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইতিকা বিশ্বাস আফসোস প্রকাশ করে বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে খেলাধুলা অপরিহার্য। কিন্তু তাদের বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠই নেই। তার ওপর আবার স্কুলের সঙ্গেই ব্যস্ত প্রধান সড়ক। টিফিনের বিরতিতে শিশুরা একটু দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে প্রায়ই গাড়ির সামনে চলে যায়, যা সারাক্ষণ মারাত্মক দুর্ঘটনার আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শুধুমাত্র কে শিমুলিয়া বিদ্যালয়ই নয়, নড়াইল জেলাজুড়ে এমন ১১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নেই। উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সদর উপজেলার ১৭৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৮টিতে, লোহাগড়া উপজেলার ১৬৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬টিতে এবং কালিয়া উপজেলার ১৫৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫১টি বিদ্যালয়ে খেলার কোনো মাঠ নেই। অর্থাৎ, জেলার মোট ৪৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১-চতুর্থাংশের বেশি স্কুলেই শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার ন্যূনতম সুযোগ নেই। তবে জেলার কতগুলো বিদ্যালয়ে মাঠ নেই সেই সমন্বিত তথ্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দপ্তরে সংরক্ষিত নেই।
সদর উপজেলার আগদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারজানা আকুতি জানিয়ে বলে, তাদের স্কুলে কোনো খেলার মাঠ না থাকায় তারা স্কুলে এসে খেলাধুলা করতে পারে না। খেলাধুলার প্রয়োজন হলে তাদের অন্য স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তাই তারা নিজেদের স্কুলেই একটি নিজস্ব খেলার মাঠ চায়।
আগদিয়া শিমুলিয়া স্কুলের প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রীনা রানি জানান, বিদ্যালয়ের ঠিক পাশেই খোলা রাস্তা ও নদী। কোনো খেলার মাঠ না থাকায় কখন যে কী দুর্ঘটনা ঘটে সেই ভয়ে সন্তানকে একা স্কুলে ছাড়তে পারেন না। স্কুলে একটি সীমানা ঘেরা মাঠ থাকলে শিশুরা নিরাপদে দৌড়াদৌড়ি করতে পারত।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যূনতম ৩৩ শতক জমির প্রয়োজন হলেও নদীভাঙন ও স্থানস্বল্পতার কারণে কিছু বিদ্যালয়ে মাঠের জায়গা কমে গেছে। যেসব বিদ্যালয়ে মাঠ নেই, তারা সাময়িকভাবে পাশের মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাঠ ব্যবহার করে। মাঠসংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে উর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সরকার জায়গা অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।

এম. মুনীর চৌধুরী, নড়াইল