প্লাস্টিকের দাপটে বিলুপ্তির পথে কেশবপুরের মৃৎশিল্প
বিভিন্ন রঙের মৃৎসামগ্রী গৃহস্থালির প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি গ্রামীণমেলা ও উৎসবে তৈরি করত এক অনাবিল আনন্দ। কিন্তু আজ সময় বদলেছে। আধুনিকতার পরশ আর প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের দাপটে যশোরের কেশবপুরে ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে গ্রামবাংলার হাজার বছরের এই লোকজ ঐতিহ্য।
কেশবপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে দেখা মিলল ঐতিহ্যবাহী এই মাটির পণ্যের। ছোট্ট একটি দোকানে থরে থরে সাজানো হাঁড়ি, পাতিল, প্লেট, মগ, ফুলদানি, টব, বিশেষ পানির জগসহ প্রায় শতাধিক পদের মাটির সামগ্রী। ১০ টাকা দামের মাটির ব্যাংক থেকে শুরু করে ২৫০ টাকা দামের বিশেষ পানির জগ এবং গৃহস্থালির ‘ঝিলে সরা’ সবই রয়েছে সেখানে। কিন্তু দোকানে নেই ক্রেতাদের কোলাহল।
কেশবপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে দীর্ঘ দিন ধরে মাটির এসব পণ্য বিক্রি করছেন সুভাষ চন্দ্র পাল। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, সকাল থেকে বসে মাত্র ১০০ টাকার পণ্য বিক্রি করেছি। বর্তমানে প্লাস্টিকের সামগ্রী তুলনামূলক সস্তা ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় মানুষ আর মাটির পাত্র কেনে না। ফলে আমাদের ব্যবসায় ধস নেমেছে।
আরেক প্রবীণ মৃৎশিল্পী ও ব্যবসায়ী ৮০ বছর বয়সী ব্রু দাস পাল নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তুলে ধরলেন বর্তমান সংকটের মূল কারণ। তিনি জানান, বর্তমানে মাটির পণ্যের একটি বড় অংশ যশোরের দায়তলা থেকে পাইকারি দরে সংগ্রহ করা হয় এবং সামান্য কিছু স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়। কিন্তু এলাকায় ইটভাটা বেড়ে যাওয়ায় মাটির পণ্য তৈরির উপযোগী দো-আঁশ ও এঁটেল মাটি আর সহজে পাওয়া যায় না। দূরবর্তী এলাকা থেকে বেশি দামে মাটি কিনে এনে পণ্য তৈরি করায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে উৎপাদন খরচ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেশবপুর উপজেলার আলতাপোল পালপাড়া, ব্রহ্মকাটি ও ঐতিহ্যবাহী বুড়িহাটী গ্রামের হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার এখনও বংশ পরম্পরায় এ পেশা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে কাঁচামালের চড়া দাম, সরকারি-বেসরকারি প্রণোদনা বা সহজ শর্তে ঋণের অভাব এবং বাজারে বিক্রি কমে যাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের। ফলে তরুণ প্রজন্ম আর এ পেশায় আসতে চাইছে না; বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিচ্ছে পৈতৃক ব্যবসা।
কেশবপুর ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই প্লাস্টিকের পণ্য দেখে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। সত্যি বলতে, মাটির তৈরি জিনিসপত্রের স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত সুবিধা নিয়ে আমাদের প্রজন্মে তেমন আলোচনা বা সচেতনতা নেই।
পরিবেশবিদদের মতে, মাটির পণ্য কেবল ঐতিহ্যের স্মারক নয়, এটি শতভাগ পরিবেশবান্ধবও বটে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখা জরুরি। প্রথাগত তৈজসপত্রের পাশাপাশি আধুনিক গৃহসজ্জা (ইন্টেরিওর), শোপিস এবং ই-কমার্সভিত্তিক অনলাইন বাজারজাতকরণে তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে এ শিল্পের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
হারিয়ে যাওয়া এই মৃৎশিল্পকে বাঁচাতে মৃৎশিল্পীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ দান, কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন কেশবপুরের স্থানীয় মৃৎশিল্প কারিগর ও সুশীলসমাজ।

ইনামুল হাসান, যশোর (মনিরামপুর-কেশবপুর)