প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়াচ্ছেন দীপ, রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে ফের তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাত এই আদেশ দেন।
এদিন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামিকে চার দিন রিমান্ড শেষে হাজির করে পুলিশ। এরপরে নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তাকে আবারও সাত দিনের রিমান্ডে চেয়ে আবেদন করেন। এর আগে গত ৩১ অক্টোবর এ মামলায় আসামির চার দিন রিমান্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
আজ দুপুরে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতে তোলা হয় দীপকে। দীপকে আদালতে তোলার পরে এজলাসে সাংবাদিক ও আইনজীবীরা কানায় কানায় ভর্তি হয়ে যায়। এরপরে বিচারক বিরক্ত হয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আদালতের মধ্যে সাংবাদিকরা কেন? আপনারা কি ভেতরে ঢুকতে পারেন? শুনানির পর পিপি-এপিপিরা আপনাদের বিস্তারিত জানাবে। আপনারা বেরিয়ে যান। আপনারা থাকতে পারবেন না।
এ সময় বিচারক পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সব ক্লিয়ার করেন, কেউ থাকবে না ভেতরে। পরে সাংবাদিকরা এজলাসের পেছনে একপাশে গিয়ে দাঁড়ান। পরে শুনানি শুরু হয়।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব ও সাবেক জেলা জজ শাহজাহান সাজু বলেন, এটা যেহেতু ক্যামেরা ট্রায়াল নয়, ওপেন ট্রায়াল। সেহেতু শুধু জার্নালিস্টরা নয়, পাবলিকরাও থাকতে পারবে। আর সাংবাদিকরা জাতির দর্পণ ও ন্যায়বিচারে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেন। ওপেন ট্রায়ালে তারা থাকলে শুনানিতে কী হলো, তা জাতিকে জানাতে পারেন। সুতরাং সাংবাদিকদের এজলাস থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা বলা ঠিক হয়নি।
এরপরে মামলার রিমান্ড শুনানি শুরু হয়। রিমান্ড শুনানির প্রথমে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফিরোজ উদ্দিন বলেন, প্রথম দফার রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এই আসামি ঘটনার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আসামি অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির। তাই তিনি জিজ্ঞাসাবাদে একাধিক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে যান, নীরবতা পালন করেন। নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে আবার রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।
অপরদিকে তদন্তকর্মকর্তাকে সমর্থন জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন শুনানি করে বলেন, মাননীয় আদালত আসামিকে তদন্তের স্বার্থে ফের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন। আসামির সঙ্গে এই মামলার ভুক্তভোগীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। আসামি সুকৌশলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এড়িয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে তাকে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন। সিসিটিভি ফুটেজ, কথোপকথন বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই মামলার সঙ্গে অন্য কোনো রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত কি না। ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তা জানার জন্য তাকে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন আরও বলেন, রেস্তোরাঁয় অবস্থানের সময় দীপের ওই ১৫-২০ মিনিটের অনুপস্থিতি তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় তিনি কার সঙ্গে কী কথা বলেছেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ঘটনার সময় এবং তার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত দীপ নিহত তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন। বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ, দীপের বক্তব্য, কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) এবং হত্যার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য মিলিয়ে দেখা দরকার। এসব তথ্য যাচাই করে ঘটনার পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা বা কোনো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ছিল কি না, তা জানতে চান তারা।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, ঘটনার পরও দীপের মধ্যে কোনো উদ্বেগ দেখা যায়নি। তিনি বিষয়টি নিয়ে নীরব ছিলেন। রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেলেও সেগুলোর কিছু কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। মামলার পূর্ণাঙ্গ রহস্য উদঘাটনে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন।
দীপের আইনজীবী বলেন, মাননীয় আদালত রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, আসামি ইতোমধ্যে তথ্য দিয়ে দিয়েছেন। এখন তাকে চাপ প্রয়োগ করে অন্যদের প্রত্যাশিত বক্তব্য আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে। চারদিনের রিমান্ড শেষ হওয়ার পর আবার রিমান্ড চাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। পাশাপাশি রিমান্ডে দীপের স্বাস্থ্য ও খাবারের যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা জানার বিষয়েও আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
নথি থেকে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তাহসিফ। পরদিন বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে রাজধানীর উত্তরখান থানায় ৩০ অক্টোবর রাতে মামলা করেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। পরে এ মামলায় দীপকে সন্দেহজনক আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
এজাহারে বলা হয়েছে, গত ২৭ অক্টোবর আমার ছেলে কে এম তাহসিফ সৌরি আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টার পর দীপ নামে তার এক জুনিয়রের ডাকে বাসা থেকে বাইরে যায়। রাত বেশি হলেও ছেলে ফিরে না আসায় তার মা বারবার ফোনে যোগাযোগ করলে সে জানায়, কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরবে। পরে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তার ফোন থেকে মায়ের ফোনে ভয়েজ মেসেজ পাঠায়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি’। কিন্তু রাত পেরিয়ে পরের দিন বিকেল হলেও সে ফিরে আসেনি।
পরে ২৮ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক ৫টা ২০ মিনিটে উত্তরখান থেকে নৌপুলিশ ফোনের মাধ্যমে আমাকে জানায়, রাজারবাড়ি ঘাট উত্তরখান এলাকাতে তুরাগ নদ থেকে আমার সন্তানের মরদের উদ্ধার হয়েছে। এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক কার্যক্রম শেষে ২৯ অক্টোবর দুপুরে নৌপুলিশ আমার কাছে আমার সন্তানের মরদেহ হস্তান্তর করে। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় রীতি সম্পন্ন করে ২৯ অক্টোবর বিকেলে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

আদালত প্রতিবেদক