শিক্ষার্থীদের প্রতি অভিভাবকসুলভ আচরণে ব্যর্থ প্রশাসন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরাজমান পরিস্থিতি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও বিশিষ্ট নাগরিকরা।
আজ মঙ্গলবার ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ ১৭ বিশিষ্ট ব্যক্তির পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাঈদ ফেরদৌসের সই করা গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গত ২৬ মে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সংঘটিত দুর্ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজন ছাত্রের অকাল মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু এবং ক্যাম্পাসে মৃতদের জানাযার আয়োজন না করতে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, আমরা তাতে গভীরভাবে মর্মাহত। সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগের উৎসগুলো থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, বিশ্ববিদ্যালয়টির শোকবিহ্বল শিক্ষার্থীরা যখন ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী মহাসড়কে নিয়মিত ঘটতে থাকা দুর্ঘটনা এবং তৎজনিত মৃত্যুর প্রতিকার চেয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিল, তখন তাদেরকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে পুলিশ সমবেত শিক্ষার্থীদের ওপর খুব কাছ থেকে টিয়ারশেল এবং রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত আট থেকে দশজন শিক্ষার্থী আহত হয়, এদের মাঝে কয়েকজন রাবার বুলেটে বিদ্ধ হয়। সংক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা পুলিশি হামলার ব্যাখ্যা চাইতে উপাচার্যের বাসভবনে সমবেত হয়, কিন্তু উপাচার্য এ সময় শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎ দেননি। ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় উপাচার্যের সাক্ষাতের আশায় বসে থাকা ৪২ জন শিক্ষার্থীকে গভীর রাতে পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং ৪৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই আচরণকে অবিবেচনাপ্রসূত উল্লেখ করে এতে বিস্মিত হয়েছেন বলে জানান বিবৃতিতে সই করা ১৭ বিশিষ্ট নাগরিক। তাঁরা বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই এমন গণগ্রেপ্তারের ঘটনার নজির নেই। উপরন্তু, নারী শিক্ষার্থীদের গভীর রাতে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত ছাত্রকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে গ্রেফতারকৃতদের আদালতে চালান দেওয়ার ঘটনাও সকলকে মর্মাহত করেছে।’
১৭ শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও বিশিষ্ট নাগরিক মনে করেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের উচিত বিশ্ববিদ্যালয় পরিবরের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা। কিন্তু জাবির সাম্প্রতিক ঘটনায় মনে হয়েছে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের প্রতি অভিভাবকসুলভ যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা, গণগ্রেপ্তার ও মামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান তাঁরা।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘আমরা আআরো মনে করি, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে উপাচার্যের বাসভবনে ভাঙচুর ও দুর্ব্যবহারের ঘটনা যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারও তদন্ত, মীমাংসা অথবা শাস্তি প্রদান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর মাঝেই হতে পারত, এর জন্য এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মামলার সম্মুখীন করা বা কারাগারে পাঠাবার প্রয়োজন ছিল না। বরং, সহপাঠীর মৃত্যুর মতো যে সংবেদনশীল পরিস্থিতির শিকার হয়ে এই শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনে গিয়েছিল, সেটা উপলব্ধি করে তাদের প্রতি আরো সহানুভূতিশীল আচরণ করাটাই সমীচীন ছিল বলে আমরা মনে করি।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত মামলা তুলে নিয়ে আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করবে এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাভাবিক কর্মযজ্ঞে ফিরে যাবে বলেও বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে সই করা এবং ই-মেইলে সংহতি জানানো বিশিষ্ট নাগরিকরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মানবাধিকারকর্মী ড. হামিদা হোসেন, লেখক ও সমাজকর্মী সৈয়দ আবুল মকসুদ, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইতিহাসবিদ আহমেদ কামাল, মানবাধিকারকর্মী খুশি কবীর, অর্থনীতিবিদ ও লেখক অধ্যাপক স্বপন আদনান, মানবাধিকারকর্মী শিরীন হক, আলোকচিত্রী শহীদুল আলম, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ফাহমিদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাট্যকর্মী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী হাসনাত কাইয়ুম, সংগীতশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী অরূপ রাহী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিমউদ্দীন আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা।

অনলাইন ডেস্ক