আলোকচিত্র
স্টিফেনের ক্যামেরায় নেপালের ভূমিকম্প
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে গেল পাঁচদিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘নেপাল ভূমিকম্প-২০১৫’। নেপালে ভূমিকম্প পরবর্তী বেশ কিছু ছবি নিয়ে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই এ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর ছবিগুলো ধারণ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অতিথি শিক্ষক স্টিফেন ট্রুয়্যাক্স একার্ড। প্রদর্শনীর এক ফাঁকেই তাঁর বাংলাদেশে আসা, নেপালে ভূমিকম্পের পূর্বের ও পরবর্তী অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ব্যাপারে সচেতনতার অবস্থা ও এখানকার প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন সমূহের অবস্থা ও করণীয় নিয়ে এনটিভি অনলাইনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা আহসান হাবীবের সাথে কথা বলেন তিনি।
জন্ম ও কর্মজীবন
আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের সিলভারস্প্রিং ম্যারিল্যান্ডে আমার জন্ম এবং সেখানেই বেড়ে উঠা। তৃতীয় শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায়ে শিল্প ও ইতিহাস বিষয়ে অধ্যাপনা করেছি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচিং অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবেও কাজ করেছি । এ ছাড়া পিস কর্পস ‘ক্রস কালচারাল স্টাডিজ ট্রেইনার’ হিসেবেও বেশ ক’বছর কাজ করার পর ভলান্টিয়ারদের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছি।
নেপালে গমন
১৯৬৬ সালে একজন পিস কর্পস ভলান্টিয়ার হিসেবে সর্বপ্রথম নেপালে যাই। সেখানে ২০ বছর বাস করতে গিয়ে কৃষক এবং ছোট ছোট গ্রামের অধিবাসীদের নিয়ে দক্ষিণ নেপালে কাজ করেছি। সেখানকার গ্রাম্য সংস্কৃতি ও শিল্প এবং কাঠমান্ডুর একক শিল্প ও প্রত্ন নিদর্শনের গভীর প্রেমে পড়ে যাই। প্রায় ৫০ বছর ধরে সেখানকার আদিবাসী শিল্প এবং রাজবংশীয় শিল্প নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ হয়েছে আমার। সে সময় নেপালের শিল্প-সাহিত্য নিয়ে কোনো বই ছিল না বললেই চলে। নেপালের যাওয়ার পর সেখানকার শিল্প-সংস্কৃতির উপর প্রায় ১৫-২০ হাজার ছবি তুলি। এ ছাড়া নেপালের উৎসব, জীবনযাত্রার ধরন, বিয়ে, মেলা, যাত্রা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর প্রায় ২০০ ঘণ্টার ভিডিওচিত্রও ধারণ করি। ফলে সেই গ্রামীণজীবনের ওপর আমার হাতে বিশাল বড় একটি আর্কাইভ তৈরি হয়েছে।
তবে সে সময় কোনো ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল না বলে সেসব সাদাকালো ছবিগুলো প্রকাশ করা অনেক দুরূহ। এখন আমাকে কয়েক হাজার ছবিকে ডিজিটালে রূপান্তর করতে হবে। গত আগস্টে অবসরে যাওয়ার আগে সেসব ছবি ও ভিডিও ডিজিটালে রূপান্তরের চিন্তাভাবনা শুরু করেছি যা একটা পাঁচ বছর মেয়াদি প্রজেক্ট। এরপর এসবের ওপর ভিত্তি করে নেপালের জীবনযাত্রা নিয়ে বেশ কিছু প্রদর্শনী ও ডকুমেন্টারি শো করার ইচ্ছে রয়েছে।

বাংলাদেশে আসার কারণ
প্রায় চার বছর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সিকদার মো. জুলকারনাইনের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে আসি। জুলকারনাইন ওয়াশিংটনে আমার ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করেছে। পরে সে আমাকে এখানে এসে জাদুঘর স্টাডিজ বিষয়ে ক্লাস নিতে আমন্ত্রণ জানায়।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক নিদর্শন সাইটগুলো খুবই সমৃদ্ধ। এখানকার ধর্মীয় সম্প্রীতিও অসাধারণ। এখন পর্যন্ত যতগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। পাল, সেন যুগ এবং ভারতীয় আর্ট থেকে বাংলা সংস্কৃতি সম্পর্কে একটা ধারণা আগে থেকেই পেয়েছি। মূলত নেপালি শিল্পকর্ম নিয়ে গবেষণা করার সময়ই বাংলা সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারি। নেপালের শিল্পকর্মে বাংলা শিল্পের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। সেখান থেকেই এ সম্পর্কে এক ধরনের আগ্রহ জন্ম নিয়েছে।
নেপালের সাম্প্রতিক ভূমিকম্প
নেপালে ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার সময় আমি বাংলাদেশে ছিলাম। সেদিন বরিশালের পাটুয়ারহাটে সিকদার জুলকারনাইনের গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। আমাদের সাথে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী তখন একটি পুকুরে মাছ ধরছিল। হঠাৎ সবাই খেয়াল করল যে পুকুরের মাছ পানির অনেক উপরে উঠে লাফাতে শুরু করে। সাথে সাথে সবাই আরেকটা জিনিস দেখে ব্যাপক অবাক হলাম যে পুকুরের পানি অস্বাভাবিকভাবে ঢেউ খেলতে শুরু করল। শিক্ষার্থীরা তাদের মোবাইল ফোন থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জেনে আমাদের জানাল যে নেপালে একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে।
নেপালে আমার পরিবার রয়েছে, অসংখ্য বন্ধু রয়েছে। কিন্তু পাঁচ দিন চেষ্টা করেও আমি তাদের কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। সাহিত্যিক, শিল্পী, নৃত্যশিল্পী, সাধারণ জনতা মিলিয়ে অসংখ্য শুভাকাঙ্খী রয়েছে সেখানে। একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। সেখানে গিয়েই যেটা দেখলাম যে হাজার হাজার লোক তাদের বাসস্থান ছেড়ে খালি মাঠে আশ্রয় নিয়েছে। ঘরে ফেরার ব্যাপারে তারা ভয়ে ছিল। আবার ভূমিকম্প হতে পারে- এমন ভয়ে লোকজন তাদের ঘরে না গিয়ে সামনের খোলা জায়গায় বসে থাকত। প্রতিদিনই কয়েকবার কম্পন অনুভূত হতো।

বিধ্বস্ত নেপালে
৭.৮ মাত্রার ওই ভূমিকম্প হওয়ার পর নেপালে আমি যাই। একদিন আমি আমার ঘরে ছিলাম। হঠাৎ টের পেলাম যে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি হলো। পরে জানলাম যে ৬.৮ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পে প্রকম্পিত নেপাল। যার ফলে আরো অনেক ভবন ধ্বসে পড়ল, অনেক বাড়িঘর ধ্বংস হয় এতে। আমি একজন সমাজ বিজ্ঞানী হওয়ায় দৌড়ে পালাবার মতো ভয় পাইনি। আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম কীভাবে মানুষ চিৎকার চেঁচামেচি করে তাদের বাড়িঘর থেকে দ্রুত বের হয়ে যাচ্ছিল। রাস্তা-ঘাট এবং সব কিছুই কাঁপছিল তখন।
ভূকম্পনবিদরাও ভাবেননি যে এত শক্তিশালী একটি ‘সেকেন্ড শক’ হতে পারে। কম্পন থামার পর আমার ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম এবং সেসব জায়গায় গেলাম যেখানকার ধ্বংসাবশেষের ছবি তুলেছিলাম। গিয়ে দেখি যে দ্বিতীয়বারের ভূমিকম্পের কারণে আরো অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। প্রধান প্রধান মন্দিরগুলো সম্পূর্ণভাবে ভূপাতিত হয়েছে। শুধু ভিত্তি ছাড়া ঐসব স্থাপনার আর কিছুই নিজের অবস্থানে ছিল না। বাড়িঘরগুলো রাস্তায় নেমে এসেছে, রাস্তায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল।
প্রদর্শনীর পেছনের কথা
ভূমিকম্পের ১০ দিন পর নেপালে যাই এবং দুই মাস সেখানে অবস্থান করি। নেপালের শুধু পাতেন শহরের ধ্বংসাবশেষের ছবি তোলার মাধ্যমে এর দালিলিক প্রমাণ সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেছি। কেননা ওই শহরে আমি প্রায় ১৫ বছর ছিলাম আগে।
চলমান প্রদর্শনীতে দুই ধরনের ছবি রয়েছে। ভূমিকম্পের আগে তোলা ছবি এবং ভূমিকম্পের পরে তোলা ছবি। আগে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে সেসব স্থানগুলো দর্শনার্থী ও নানা ধরনের লোকে জনাকীর্ণ। ভূমিকম্পের পর সেখানে গিয়ে দেখলাম যেন সবকিছু ‘উধাও’, শুধু ইট-কাঠের স্তূপ দৃশ্যমান। সেখানে থাকা নানা ধরনের ধর্মীয় নিদর্শনগুলোও চূর্ণ-বিচূর্ণ তখন। গোটা শহর আক্রান্ত, যান চলাচল বন্ধ। তার আগের রাতেও সবকিছু ঠিক ছিল। শত শত গ্রাম ধুলায় মিলে গেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে নেপালে প্রতি ৮০ বছর পর পর এ ধরনের বড় মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এর আগে ১৯৩৪ সালে এ রকম একটি ভূমিকম্প হয়েছিল সেখানে।

একদিন হাঁটতে হাটতে একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম যে, যেসব ভবনে অতিরিক্ত কয়েক তলা নির্মাণ করা হয়েছে, সাধারণত সেসব ভবনই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অতিরিক্ত সাপোর্ট ছাড়াই সেসব ভবন উঁচু করা হয়েছিল। আবার বেশ কিছু ভবন দেখলাম যেগুলোতে কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে একটা ব্যাপার হচ্ছে, রাজপ্রাসাদের কোনো ক্ষতি হয়নি।
নেপালে পরিবার ও বন্ধুরা
ভূমিকম্পে প্রায় ৯ হাজার প্রাণহানি ঘটলেও সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো আমার কোনো বন্ধুর জীবনহানি ঘটেনি। তবে তাঁরা বাড়িঘর হারিয়েছে। এ ভূমিকম্পটি শনিবার দুপুরে ঘটেছে। অফিস ছুটি ছিল, সবাই সকালের খাবার খেতে পেরেছিল, বেশির ভাগ পুরুষ ঘরের বাইরে মাঠে কাজ করছিল অথবা বাজারে ছিল। শুধু নারী ও শিশুরা ঘরে ছিল। যখন ঘরবাড়ি কাঁপতে শুরু করল, বেশির ভাগই দৌড়ে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। বেশির ভাগ লোকই প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হয়েছে। রাতের বেলা এ ভূমিকম্প হলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারত তা তো কল্পনাতীত।
ঢাকার সৌন্দর্য
৫০ বছর আগে কাঠমান্ডু উপত্যকা ছিল পৃথিবীর অন্যতম দৃষ্টিনন্দন উপত্যকা, আজ সেটা একটা বড় ‘বস্তি’তে পরিণত হয়েছে। ঠিক যেমনটা ঘটেছে তোমাদের ঢাকা শহরের বেলায়। ঢাকা ছিল একটা ছোট, সুন্দর ও মার্জিত শহর, কিন্তু এখন দেখ কী ঘটেছে! সব কিছু রাজধানী কেন্দ্রিক, সেরা স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এখানে রাজধানী কেন্দ্রিক। গ্রামের সবাই শহরে ছুটছে। আদি নিদর্শনযুক্ত স্থাপনাগুলো ভেঙে উঁচু ভবন নির্মাণ করছে। ফলে রাতারাতি প্রায় বেশির ভাগ দৃষ্টিনন্দন পুরাতন ভবন ‘নাই’ হয়ে গেছে। তৃতীয় বিশ্বের রাজধানীগুলোতে এটা প্রতিনিয়তই ঘটছে। আমি তো প্রায়ই পুরান ঢাকায় যাই এবং দেখি যে সেখানকার চিত্র পাল্টে যাচ্ছে।

আহসান হাবীব, জাবি প্রতিনিধি