রাবিতে ‘সিজেন রিজিওনাল ক্লাস্টার মিটিং’ অনুষ্ঠিত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের উদ্যোগে ‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম এডুকেটরস নেটওয়ার্কের (সিজেন) রিজিওনাল ক্লাস্টার মিটিং’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একটি শ্রেণিকক্ষে এ কর্মশালাভিত্তিক সভার আয়োজন করা হয়। এ সভা অনুষ্ঠানে সহায়তা করে ডয়চে ভেলে একাডেমি ও সিজেন বাংলাদেশ।
এ আয়োজনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।
আয়োজনটির মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থী এবং তরুণ গবেষকদের গবেষণার ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট’ এবং ‘রিসার্চ কনসেপ্ট নোট’ তৈরিতে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এর মাধ্যমে তারা আগামী ২৭-২৮ নভেম্বর ঢাকার ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে (আইইউবি) অনুষ্ঠিতব্য ১১তম সিজেন নেটওয়ার্কিং কনফারেন্সে নিজেদের গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত হতে পারবেন।
সকাল সাড়ে ৯টায় উদ্বোধনী পর্বের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হোসেন বকুল। বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, সংবাদ গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে শর্ট-ফর্ম ভিডিওর ব্যবহার এবং ভুল তথ্যের মতো সমসাময়িক চ্যালেঞ্জগুলো শুধু শ্রেণিকক্ষের প্রশ্ন নয়, বরং আমাদের সমাজ, গণতন্ত্র ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন।’
ড. মো. মোজাম্মেল হোসেন বকুল গবেষণার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের নিখুঁত অ্যাবস্ট্রাক্ট লেখার চাপ না নিয়ে তিনটি ধাপে কাজ করার পরামর্শ দেন—সুনির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করা, অর্থপূর্ণ গবেষণার প্রশ্ন তৈরি করা এবং সেই প্রশ্নের উত্তর কেন গুরুত্বপূর্ণ তা অনুধাবন করা। এ ছাড়া তিনি শিক্ষকদের শুধু নির্দেশক নয়, বরং ‘মেন্টর’ হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানান এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) উপ-উপাচার্য এবং সিজেন বাংলাদেশের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. জুড ডব্লিউ আর জেনিলো। বক্তব্যে তিনি সিজেনের ইতিহাস স্মরণ করে বলেন, ২০১৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাজশাহী ডিক্লারেশন’ এর মধ্য দিয়েই মূলত সিজেনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ, জ্ঞান বিনিময় এবং যৌথ গবেষণা বৃদ্ধি করাই এই নেটওয়ার্কের মূল লক্ষ্য।
আসন্ন ১১তম সিজেন কনফারেন্স সম্পর্কে ড. জুড ডব্লিউ আর জেনিলো বলেন, এবারের কনফারেন্সের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘মিডিয়া এডুকেশন ইন ট্রানজিশন’। সাংবাদিকতা শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং ভুল তথ্য মোকাবিলার মতো সমসাময়িক বিষয়গুলো এবারের আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।
শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সিজেন বাংলাদেশের সভাপতি বলেন, কনফারেন্সে অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহীদের ২৫০ শব্দের মধ্যে অ্যাবস্ট্রাক্ট জমা দিতে হবে। নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে তিনি শিক্ষার্থীদের একাধিক বিষয়ের ওপর অ্যাবস্ট্রাক্ট জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন।
বেলা সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হওয়া ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট ডেভেলপমেন্ট ও রাইটিং’ বিষয়ক মূল প্রশিক্ষণ সেশনগুলো পরিচালনা করেন রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিহুর রহমান এবং সহযোগী অধ্যাপক মামুন আব্দুল কাইয়ুম।
সহযোগী অধ্যাপক মামুন আব্দুল কাইয়ুম তার সেশনে একটি আদর্শ অ্যাবস্ট্রাক্ট লেখার নিয়ম ও এর বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘একটি অ্যাবস্ট্রাক্ট হলো সম্পূর্ণ গবেষণাপত্রের লিড বা ইন্ট্রো, যা পড়ে একজন পাঠক বা রিভিউয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি পুরো পেপারটি পড়বেন কি না।’
সহযোগী অধ্যাপক মামুন আব্দুল কাইয়ুম আরও জানান, অ্যাবস্ট্রাক্টে সাধারণত টাইটেল, প্রবলেম স্টেটমেন্ট, ইন্ট্রোডাকশন, মেথড, অ্যানালাইসিস বা রেজাল্ট, কনক্লুশন ও কি-ওয়ার্ড থাকতে হয়। এ ছাড়া কনফারেন্সের গাইডলাইন অনুযায়ী শব্দসীমা মেনে চলা এবং সাবমিট করার আগে অন্য কাউকে দিয়ে রিভিউ করানোর পরামর্শ দেন তিনি।
একই সেশনে অধ্যাপক ড. মো. মশিহুর রহমান অ্যাবস্ট্রাক্ট লেখার সময় শব্দ-সাশ্রয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, অ্যাবস্ট্রাক্টে কোনো সাব-হেডিং বা পয়েন্ট ব্যবহার না করে সাবলীল বর্ণনার মাধ্যমেই গবেষণার উদ্দেশ্য, ব্যাকগ্রাউন্ড, মেথডোলজি, ফলাফল এবং এর তাৎপর্য ফুটিয়ে তুলতে হবে। অ্যাবস্ট্রাক্ট লেখার কৌশল নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে ২৫০ শব্দের একটি অ্যাবস্ট্রাক্ট লেখার অনুশীলন করান পরে রিভিউ দেন।
দুপুর দেড়টায় প্রশিক্ষণ শেষে সিজেনের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন বিভাগের অধ্যাপক ও সিজেন বাংলাদেশের কার্যনির্বাহী সদস্য ড. নাজিয়াত হোসেন চৌধুরী। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘নতুন মানুষের সঙ্গে মেশার এবং নতুন আইডিয়া খোঁজার সুযোগ হাতছাড়া করো না। শুধু একজনের ওপর নির্ভর না করে দুই-তিনটি আইডিয়া নিয়ে ভাবো। সিজেন তরুণ গবেষকদের জন্য চমৎকার সব সুযোগ নিয়ে আসছে, তাই এই সুযোগ লুফে নিয়ে সিজেন রিসার্চ প্রোগ্রামে সবাই সাইন আপ করো।’
এরপর সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন ডয়চে ভেলে একাডেমি ঢাকার প্রজেক্ট ম্যানেজার ও কো-অর্ডিনেটর জিমি আমির। তিনি বলেন, ‘ডিডব্লিউ একাডেমি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম উন্নয়ন ও সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করে। ২০১৪ সাল থেকে কারিকুলাম উন্নয়ন ও ক্যাম্পাস মিডিয়ার পাশাপাশি আমরা সিজেন প্রতিষ্ঠা করেছি। এ ছাড়া সিএমডির সঙ্গে যৌথভাবে ‘ফিউচার সাসটেইনেবল কোয়ালিটি মিডিয়া’ প্রকল্পের মাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমরা আনন্দিত। সিজেন একটি মর্যাদাপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নয়ন সম্ভব। এই ইভেন্ট থেকে অর্জিত জ্ঞান সংশ্লিষ্ট খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং সিজেন বাংলাদেশের কার্যনির্বাহী সদস্য আমেনা খাতুন। মধ্যাহ্নভোজের মাধ্যমে বিকেল ৩টায় এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক