বাবার রাজনীতির পতাকা মেয়ে আফরোজা খানম রিতার হাতে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-৩ (সদর, সাটুরিয়া) আসনে বাবা মরহুম হারুনার রশীদ খান মুন্নুর রাজনীতির পতাকা এখন মেয়ে আফরোজা খানম রিতার হাতে। লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি মনোনীত এই প্রার্থী।
বেসরকারি ফলাফলে আফরোজা খানম রিতা পেয়েছেন এক লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুহাম্মদ সাঈদ নূর (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস) পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট।
স্বাধীনতার পর এই আসন থেকে প্রথম নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়লেন আফরোজা খানম রিতা। তার রাজনৈতিক প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন প্রয়াত বাবা হারুনার রশিদ খান মুন্নু—তিনি খ্যাতনামা শিল্পপতি ও বিএনপির সিনিয়র নেতা। তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-২ ও মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে দুটি আসনে জয়ী হয়ে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের পোর্টফোলিওবিহীন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনি প্রচারণায় বাবার পাশে থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন রিতা। ২০০৮ সালে নিজের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় বাবার হাত ধরে এগিয়ে যাওয়ার সেই ছবি আজও স্থানীয়দের আবেগে নাড়া দেয়—তা যেন রাজনীতির পতাকা হস্তান্তরের এক প্রতীকী মুহূর্ত। ২০১৭ সালের ১ আগস্ট বাবার মৃত্যুর পর জেলার রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মাঠে নামেন তিনি।
আফরোজা খানম রিতা ২০১৮ সালের নির্বাচনি প্রচারণায় হামলার শিকার হওয়ায় তার স্বপ্ন অপূর্ণ থাকে। ২০২৪ সালে দলীয় সিদ্ধান্তে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় তিনিও প্রার্থী হননি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এবারের নির্বাচনে নতুন উদ্যমে মাঠে নেমে তিনি প্রমাণ করেছেন—তার সংগ্রাম থেমে থাকেনি।
দলীয় প্রধান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জাতীয়ভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় তার এই জয় রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আফরোজা খানম রিতার জয়ের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাজ করেছে—যেমন গ্রাম থেকে শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে সরাসরি গণসংযোগ, নারী ভোটারদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়।
মানিকগঞ্জ বিএনপির সাংগঠনিক ঘাঁটি হওয়ায় আফরোজা খানম রিতার এই শক্তি সুসংহত ছিল। প্রয়াত বাবা হারুনুর রশিদ খান মুন্নুর সময়কার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এখনও ভোটারদের মনে জীবন্ত। তাই দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থাকা ও সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ রিতার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আ ফ ম নূরতাজ আলম বাহার বলেন, ‘দলের দুঃসময়ে আফরোজা খানম রিতা নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। মানুষ তার প্রতিদান দিয়েছে ভোটের মাধ্যমে।’
এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল মোট প্রার্থীর ৪ শতাংশেরও কম। এমন প্রেক্ষাপটে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয় নিঃসন্দেহে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে নতুন অনুপ্রেরণা জোগাবে।
আফরোজা খানম রিতার নির্বাচনি প্রচারণার গান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে—বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে।
আফরোজা খানম রিতার কাছে এখন মানিকগঞ্জ-৩ আসনের ভোটারদের প্রত্যাশা—শহর-গ্রামের সংযোগ সড়কের উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে বাস্তব উদ্যোগ।
বিজয়ের প্রতিক্রিয়ায় আফরোজা খানম রিতা বলেন, মানিকগঞ্জের মানুষের ভালোবাসা ও আস্থাই আমার শক্তি। উন্নয়ন হবে দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ